আদ্যাশক্তি মহামায়া, দেবীত্বে ” দশমহাবিদ্যা “……


শেয়ার করুন সকলের সাথে~

দেবীপক্ষ শুরু হয়েছে সেই মহালয়ার ভোরে আপামর জনগণের দেবীমূর্তি আহ্ববানে। কিন্তু মা কি শুধুই এক মহাময়াতে সীমাবদ্ধ? আপনারা কি বলেন? না, মা বহুরূপের বিভিন্ন নামের নামী , আদ্যাশক্তি মহাময়া। মা শক্তিরূপিনী। তবে শক্তি একটাই, রূপ বিভিন্ন। তাই রূপের ভিন্নতা দিয়ে মা কে চিনে নিতে চাই আমরা। আসুন তবে দশমহাবিদ্যায় আদ্যাশক্তি মহামায়াকে চিনব আমরা।

Related image

কালী…

“কাল “ শব্দের দুটি অর্থ  রয়েছেঃ “নির্ধারিত সময় “ ও “ মৃত্যু “।সংস্কৃত সাহিত্যের গবেষক টমাস কর্বানের মতে , “কালী” শব্দটি “কৃষ্ণবর্ণ” বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হতে পারে। কাল সৃষ্টি , পরিবর্তন , স্থিতি , ধ্বংস ও শক্তির দেবী ।“কালী “ শব্দটি “কাল” শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ। এই শব্দের অর্থ “ ঘোর বর্ণ”।“মহাভরত” এ “কালরাত্রি” বা কালী নামে এক দেবীর উল্লেখ আছে । তবে এখানে দেবী যুদ্ধে নিহত যোদ্ধৃবর্গ  ও পশুদের আত্মা বহন করে । হরিবংশ গ্রন্থে কালী নামে এক দানবীর উল্লেখ পাওয়া যায়।

Image result for সিদ্ধকালী

“তোড়লতন্ত্র “ অনুসারে , কালী আট প্রকার – “দক্ষিণকালিকা “ , “সিদ্ধকালিকা “ , গুহ্যকালিকা “ , “শ্রীকালিকা”, “ভদ্রকালিকা”, “চামুণ্ডাকালিকা “ , শ্মশানকালিকা” ও “ মহাকালী “ । অন্যদিকে, মহাকাল সংহিতায় নয় প্রকার কালীর উল্লেখ আছে । যথাক্রমে- “দক্ষিণাকালী”, “ভদ্রকালী”, “শ্মশানকালী” , “কালকালী “, গুহ্যকালী”,কামকলাকালী”, “ধণকালিকা”,”সিদ্ধিকালী” ,”চণ্ডিকালিকা”।

Image result for তারাপীঠ

তারা……

তারা হিন্দু দেবী কালীর বিশিষ্ট রূপ। তারা হলেন ভীষণা দেবী। তারার বিবিধ রূপ হলো রূপান্তরের দেবী । যেমন – উগ্রতারা , নীল সরস্বতী , কুরুকুল্লা তারা , খদির বাহিনী তারা, মহাশ্রী তারা, বশ্যতারা, সিতা তারা , ষড়ভূজ সিতাতারা , মহামায়া বিজয়বাহিনী তার ইত্যাদি।

Related image

পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার তারাপীঠে অবস্থিত তারা মন্দির বিখ্যাত।তারা রূপের প্রকৃত বর্ণনায় পাওয়া যায় “নীলবরণ লোলজিহ্বা করালবদনা । সর্পবান্ধা ঊর্দ্ধ এক জটাবিভূষণা। অর্দ্ধচন্দ্র পাঁচখানি শোভিত কপাল।ত্রিনয়ন লম্বোদর পরা বাঘছাল ।।

Image result for তারাপীঠ

নীল পদ্ম খড়্গ কাতি সমুণ্ড খর্পর । চারি হাতে শোভে আরোহণ শিবোপর। তারাপীঠের ব্রহ্মশিলায় তারামূর্তি দ্বিভূজা , সর্পযজ্ঞোপবীতে ভূষিতা এবং তাঁর বাম কোলে পুত্ররূপী শিব শায়িত ।।

Image result for ত্রিপুরাসুন্দরী

ষোড়শী……

মহাবিদ্যার তৃতীয় তম হলেন মা ষোড়শী । মাকে ত্রিপুরাসুন্দরী নামে ডাকা হয়। দেবী চার হাত , ত্রিনয়না এই দেবী পাশ , অঙ্কুশ , ধনুক ও বাণ ধারণ করে থাকেন ।এই দেবী ষোলো কলায় পূর্ণ বলে এঁনার নাম ষোড়শী। এই দেবীকে বলা হয় , “ ইনি পুরুষোওম কৃষ্ণগ বিগ্রহের মতো পূর্ণ বিকাশের প্রতীক “দেবী হলেন কালেশ্বর । ভৈরব অর্থে ভগবান শিব।এই দেবীর অন্য নামগুলি হল – । রাজরাজেশ্বরী , মহাত্রিপুরাসুন্দরী , বালাপঞ্চদশী , মহাবালা , স্রীসুন্দরী , ললিতা ।।

ভুবনেশ্বরী……

মহালক্ষ্মীস্বরূপা আদিশক্তি ভাগবতী ভুবনেশ্বরী হচ্ছেন মহাদেবের সমস্ত লীলাবিভূতির সহচরী ।তিনি ভক্তদের অভয়প্রদায়িনী ও সর্বসিদ্ধি প্রদায়িনী ।ভূবনেশ্বরীর রূপ হচ্ছে সৌম্য ও অঙ্গকান্তি অরুণবর্ণা।ঈশ্বররাত্রির জাগতিক ব্যবহার সুপ্ত থাকে , সেই অধিষ্ঠাত্রী দেবীর নাম ভুবনেশ্বরী। সর্বরুপের মূল প্রকৃতিই হচ্ছেন ভুবনেশ্বরী। ব্যক্ত জগত থেকে ক্রমশ লয় থেকে কালীরূপের প্রতিষ্ঠা পায়।

মা শ্রী অঙ্গের শোভা ধারণকারী ।তার শিরে ত্রিনয়না দেবী শ্রীমুখে মৃদু হাসির আভা । তার হাতে পাশ , অঙ্কুশ, বরদ এবং অভয়মুদ্রা শোভা পায় ।দেবী ভুবনেশ্বরীর উপাসনা পুত্রলাভের জন্য বিশেষ ফলপ্রদ।

 

ভৈরবী……

চতুঃষষ্ঠী যোগিনীগণের মধ্যে প্রধানা যোগিনীর নাম ভৈরবী। যোগিনীগণ এক অন্যতম শক্তি । তিনি তন্ত্রোক্ত অষ্ট যোগিনীর অন্যতম। সৃষ্টির প্রারম্ভে মৃত্যু হতে যে সমুদয় কন্যার উৎপত্তি হয়,তাঁরা ভৈরবা নামে পরিচিত ।“গৌরীর দেহ থেকেই কালীর উৎপত্তি।তবে তন্ত্রের এরকালিকা আর পুরাণের কালী এক নয়।“

ছিন্নমস্তা…

ছিন্নমস্তা আত্মবলিদান ও কুণ্ডলিনী জাগরণের দেবী , তাঁকে একাধারে যৌনসংযম ও যৌনশক্তির প্রতীক  মনে করা হয় ।তিনি জীবনদাত্রী ও জীবনহন্তা সত্ত্বার প্রতীক । দক্ষের কন্যা দাক্ষায়ণী ছিলেন শিবের প্রথমা স্ত্রী। দক্ষের যজ্ঞেশিব নিমন্ত্রিত না হওয়ায় অপমানিত বোধ করেন ।তিনি শিবকে বিনা নিমন্ত্রণে যেতে অনুরোধ করেন ।কিন্তু শিব রাজী নন ।তখন দাক্ষায়ণী ভীষণা দশ মূর্তি দিয়ে দশ দিক থেকে শিবকে ঘিরে ধরেন ।প্রাণতোষণী তন্ত্র বলে মন্দাকিনী নদীতে স্নান করার কালে তিনি কামার্ত হয়ে পড়েন । তাই তাঁর গাত্র বর্ণ কালো হয়ে যায়।ঠিক এই সময় তাঁর দুই সহচোরীডাকিনী ও বর্ণনী ক্ষুধার্ত করে কাদ্য প্রার্থনা । দেবী নিজের নখরাঘাতে স্বমস্তক ছিন্ন করে নিজ রক্তে তাঁদের ক্ষুন্নিবৃত্তি করেন ।

শ্রীঁক্লীঁ হ্রীঁ ঐঁ বজ্রবৈরোচনীয়ে হুঁ হুঁ ফট্‌ স্বহা”

ধূমাবতী……

পুরাণ বলে , মেরুর কন্যা আয়তি ধাতার পত্নী ছিলেন ধুমবতী । তাঁর গর্ভে প্রাণের জন্ম হয় । প্রাণের স্ত্রীর নাম ধূমবতী । দ্যুতিমান্‌ ও অজরা নামে দুই পুত্র প্রসব করেন ।

আর ধুমাবতী হলেন দশ্মহাবিদ্যার অন্যতমা গুহ্যাতিগুহ্য তন্ত্রে দশ মহাবিদ্যাকে বিষ্ণুর দশ অবতারের সূত্র বলা হয়।  এই গ্রন্থে মৎস্য অবতারের উৎস হলেন ধূমাবতী । প্রচলিত মূর্তিতে তাঁকে অশ্ববিহীন রথ বা কা্কপৃষ্ট আরূঢ়া কল্পনা করা যায় । তাঁর গায়ের রঙ ফ্যাকাসে , মলিনবস্ত্র পরিহিতা , দন্তহীন , শিথিলস্তনা ।একক্তহায় এ যেন কোপনস্বভাবা মূর্তি। তিনি দ্বিভূজা,শূল ও নরকপাল্ধারিনী। তিনি চণ্ড ও মুণ্ডের হাড় চিবিয়ে ভক্ষ্ণ করেন আর রক্তের সাথে মদ মিশিয়ে সেবন করেন । এই তমঃপ্রধান দেবী হলেন ধূমাবতী।

বগলা……

বগলা হিন্দু দশমহাবিদ্যার অন্যতম দেবী । তিনি ভক্তের মানসিক ভ্রান্তি নাশ করেন ।কিংবদন্তি বলে , একসময় যখন পৃথিবীতে ভয়ংকর ঝড় হয় , তখন সকল দেবতা তা থেকে বাঁচতে সৌরাষ্ট্র অঞ্চলে একত্রিত হন । সেইসময় দেবী হরিদ্রা সরোবর থেকে উৎপন হয়ে সেই ঝড় থামান । তিনি ভক্তের শত্রু নাশ করেন এবং মানসিক ভ্রান্তি নাশ করেন ।

মাতঙ্গী……

স্নেহময়ী জ্ঞানমূর্তি নবমা দেবী সমস্থ বিপদ থেকে ভক্তকে ত্রাণ করেন ।মতঙ্গাসুরকে বিনাশ করার জন্য দেবীকে মাতঙ্গী বলা হয়। কিংবদন্তি বলে , পুরাকালে একদা নানা বৃক্ষসমাকুল কাদম্বকাননে সমস্ত প্রাণীকে বশীভূত করার জন্য মতঙ্গমুনি শতসহস্র বৎসর ধরে নিরন্তর তপস্যা করেন । আর সেই থেকে দেবী সুন্দরীর নেত্র থেকে তেজরাশি যোগে স্বয়ং কালিকারূপ সৃষ্টি হয়।দেবীর আশীর্বাদে সাধকের মনোরথ পূর্ণ হয় আর কবিত্ব শক্তি লাভ হয়।

কমলা-কামিনী……

বরাভয় প্রদায়িনী শুদ্ধ চৈতন্যের দেবী । ভাগ্যদেবী লক্ষীর বিশিষ্ট রূপ তিনি। তবে তাঁকে তান্ত্রিক লক্ষী নামেও অভিহিত করা হয় ।

শেয়ার করুন সকলের সাথে~

Leave a Reply