সিদ্ধপীঠের পরম সাধক বামাক্ষ্যাপাঃ জেনে নিন তাঁর মাহাত্ম্য……

Rangoli Home Painting Solution

শেয়ার করুন সকলের সাথে~

 

Related image

………বামাক্ষ্যাপার তারাপীঠ………

 “মন চল নিজ নিকেতনে” ~ সত্যিই তাই মন নিজের মত করে মুক্ত বিহঙ্গ হয়ে চলতে চায় । প্রথাসর্বস্ব ভারতবর্ষের সনাতন পীঠের আমাদের যাত্রা ।  ভারতবর্ষের প্রত্যন্তর স্থান ছুঁয়ে ভক্তিপীঠের ঐতিহ্যের স্থানগুলিকে খুঁজে ফেরা ।তাই তো আজ পশ্চিমবঙ্গের  বীরভূম জেলার রামপুরহাট শহরের কাছে অবস্থিত একটি ক্ষুদ্র মন্দির নগরী তারাপীঠ” আলোচনায় আমরা ।এই শহরের তান্ত্রিক দেবী মা তারা আর  মন্দির সংলগ্ন শ্মশানক্ষেত্রের জন্য বিখ্যাত পবিত্র তীর্থক্ষেত্র ।এই মন্দির শাক্তধর্মের পবিত্র একান্ন সতীপীঠের অন্যতম ।ঐতিহ্য ও আরাধনার সাথে যুক্ত সেই মন্দির ।   কিন্তু প্রশ্ন হল এই পীঠের অবস্থান কোথায় ?তারাপীঠ বীরভূম জেলার মারগ্রাম থানার অধীনস্থ সাহাপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের একটি ছোট গ্রাম ।  প্লাবন সমভূমিরে সবুজ ধানক্ষেত্রের মধ্যে  এই  তীর্থস্থানটি অবস্থিত ।পূর্বে তারাপীঠ বাংলার সাধারণ মাটির বাড়ি আর মেছোপুকুরে ভরা গ্রামের মধ্যে  অন্যতম ছিল। কিন্তু এর প্রসিদ্ধি মাতৃভক্ত ব্যামাক্ষেপা অর্থাৎ  বামদেবের এক নামে তারাপীঠকে চেনা যায়। তারাপীঠের সর্বাধিক প্রসিদ্ধ সাধক হলেন বামাক্ষ্যপা(১৮৪৩ – ১৯১১ )।

Image result for সাধক বামাক্ষ্যাপা

বাতি যেমন তেল ছাড়া জ্বলে না , তেমন মানুষ ঈশ্বর ছাড়া বাঁচতে পারে না “

তিনি ছিলেন উনিশ শতকের অপার প্রসিদ্ধ কালীভক্ত রামকৃষ্ণদেবের সমসাময়িক ।তন্ত্রের মননে আজ তিনি ঐ শতকের বার্তা । অল্প বয়সেই তাঁর গৃহত্যাগ এবং  কৈলাসপতি বাবার হাত ধরেই তন্ত্রের হাতে খড়ি । বামদেব তারামায়ের একান্ত  একনিষ্ট ভক্ত । তারাপীঠের নিকটবর্তী মল্ল রাজাদের মন্দিরময় গ্রাম মালুটি তাঁর সাধন ক্ষেত্র।তারাপীঠের মায়ের সন্তান তিনি । এখন প্রশ্ন হল হলঃ- মায়ের প্রতি এই সন্তান কিভাবে এক হয়েছিলেন । মাটির পুতুল নাকি কথা বলে , এমন কথা বাবার কাছে  প্রথম তিনি শোনেন । আর তাকেই তিনি সত্য বলে মেনে নেন । বারে বারে মায়ের কাছে আছড়ে পড়েন তিনি । কিন্তু যখন সাধকের সাধনা নিত্য ছেড়ে সেই  চরণে নিয়োজিত হয় , তখন মনে হয় সাধ্য সাধনা সমগ্র বাধাবিঘ্ন পরিত্যাগ করতে  পারে , এখানেও তাই । ঈশ্বর ভক্তের আকুতি নেন , ভালোবাসা নেন , আর কিছু নাই । তাই বাংলায় বলা হয় ভাবগ্রাহী জনার্দন , আর সেই খোঁজে মায়ের সাথে তার সক্ষতা ।তারপর ধীরে ধীরে সাধনার গ্রুহ্য তত্ত্ব তিনি জানতে পারেন । একবার রাগ করে কাশীর মা অন্নপূর্ণার কাছে চলে যান ।কিন্তু দীর্ঘ দুদিন না খেয়ে আবার ফিরে  আসেন ।

Related image

তবে শোনা যায় , মা অন্নপূর্ণা তাঁকে নিজে হাতে খাবার খাইয়েছিলেন ।  পরে আবশ্য তিনি তাঁরও দেখা পান । মায়ের আদেশে তিনি ব্রহ্মাণ্ড আলাপ করেন । এমনকি তৎকালীন সমাজে তিনি অনেক অল্প বয়সী কিশোরীকেও দীক্ষা দেন এবং জীবন রক্ষা করেন । তারামায়ের আশীর্বাদ পুষ্ট সন্তান মানুষের আরোগ্যদানের  তন্ত্র পুরুষ । লোকশ্রুতি তিনিই বশিষ্ঠ , সেই আদি পূজার মায়ের সন্তান । জীবনের প্রথম দিকে অনেক দারিদ্র্যের মাঝে বেড়ে উঠলেও নাটোরের রাণীর প্রাপ্ত স্বপ্নাদেশে মা বামদেবের খাবারের ব্যবস্থা করেন । তিনি মায়ের ক্ষ্যাপা ছেলে । রাগ অভিমানের অংশী ।একবার পূজোর আগেই তিনি মায়ের খাবার খেয়ে ফেলেছিলেন, আর তারপরই তিনি পুরোহিতদের রোষে পড়েন । মা স্বপ্ন দিয়ে  বামদেবের প্রথম ভোজনের আদেশ দেন। এরপর থেকে মায়ের নৈবেদ্য  আগে বামদেবকে সমর্পণ করা হত । পড়াশুনার প্রতি তাঁর একদমই মতি ছিল না , তাই  তো তাঁকে হাজার চেষ্টা করেও সে পথে ব্রতী করানো যায় নি । “ছেলেটি তো অ , আ  লেখেনি , সে লিখেছে জয় তারা “ জয় তারা “ , সবপাতাতেই একই কথা লিখেছে ।“বামাচরণের এই মাতৃ আবেদন তাঁকে সাধক বামাদেবে পরিগণিত করেছে। পাড়াপ্রতিবেশীদের কাছে তিনি “হাউড়া” নামে পরিচিত , যার অর্থ হল “নির্বোধ “।মন্দির পরিচালনার কর্মচারী “দূর্গাদাস সরকার “ এর পরিচিত কৈলাস বাবাজীর সাথে বামদেবের পরিচয় ।তারাপীঠে তিনিই প্রথম কৈলাচার্য হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর হাতেই ১৩১৮ বাংলার নরলীলায় জনকল্যাণ শুরু হয়।দেবতা ও মানুষ , মানুষ ও পশুতে , জাত ও বেজাতে এবং ঘনী ও দরিদ্রের মধ্যে কোন ভেদাভেদ করেন নি।তবে তিনি বাক্‌সিদ্ধ ছিলেন । মুখে যা বলে ফেলতেন সেটাই ঘটে যেত। তারাপীঠের নগেন পাণ্ডা খুবই খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব ছিলেন । তাঁর অনুনয়ে বামদেব স্থানীয় জমিদার পূর্ণচন্দ্র সরকারকে রোগমুক্ত করতে যান । কিন্তু বাড়িতে ঢুকেই তিনি বললেন “ ও নগেন কাকা , এ শালা তো এখনি ফট” । তারপরি রুগী মারা যায় । এই হলেন বাক্‌সিদ্ধ বামদেব ।  লোক শ্রুতি বলে একবার মায়ের উপর ক্ষেপে গেলে মা বামদেব কে নিজের স্তন দিয়ে শান্ত করেন । সেই দেবী মাতৃকার স্বতঃস্ফূর্ত ব্যক্তিপুরুষকে আজ শ্রদ্ধা জানাই । সনাতনী  ঐতিহ্যে, মা তারার কৃপাধন্য তারাপীঠ প্রণাম ।বামদেব তাই  শাশ্বত আর যথার্থ।

 

লোকশ্রুতি বলে দক্ষের যজ্ঞে সতীর প্রাণ বিসর্জনের পর শিবের  উন্মাদনা আর বিষ্ণুর সুদর্শণ চক্রের যখন সতীর দেহ খণ্ড খণ্ড হয়ে যায় ,  ঠিক সেই মুহুর্তে সতীর তৃতীয় নয়ন এই তারাপীঠে পড়ে । ঋষি  বশিষ্ঠ এইটি প্রথম দেখেন এবং সতীকে তারা রূপে পূজো করতে থাকেন । কিন্তু তিনি প্রচারের অন্তরালে থেকে গেছেন চিরকাল , তবু পীঠের বৈশিষ্ঠ্য তাঁকে ছেড়ে নয় , এখানেই তাঁর সাধক বৈশিষ্য বিরাজমান ।

এই পীঠের বৈশিষ্ঠ্য হল এখানে সাধনা করলে জ্ঞান , আনন্দ ও সিদ্ধি প্রাপ্ত হয় । কিন্তু কিংবদন্তী বলে প্রথম যখন বশিষ্ঠ দেব এই তারা মায়ের পূজা করতে থাকেন , তখন তিনি অসফল হন । আর তিব্বতে গিয়ে বিষ্ণু অবতার বুদ্ধের কাছে  পরামর্শ  নেন । বুদ্ধদেব স্বপনাদেশে জানতে পারেন , তারা সিদ্ধ স্থান হল তারাপীঠ , এবং বুদ্ধদেব বাম মার্গের মদ্যমাংসাদি পঞ্চমাকার সহ তারাদেবীর পূজো  করতে নির্দেশ দেন । বুদ্ধদেবের  নির্দেশে  বশিষ্ঠ বেদ ৩ লক্ষ বার জপ করলে তারামা সন্তুষ্ট হন ।বুদ্ধ যে শিশুশিবকে স্তনপানরত অবস্থায় দেখেছিলেন , সেই রূপ দেখাতে , বশিষ্ট দেব মা কে প্রার্থনা করেন , মা প্রীত হন এবং সেই রূপই প্রস্তর অবয়বে রূপান্তরিত হয় ।

Related image

ইতিহাসের পাতা বলে রসায়ানাচার্য নাগার্জুন তিব্বত থেকে বৌদ্ধ দেবী তারা সাধনপদ্ধতি ভারতে নিয়ে আসেন ।পালযুগেই এই ধর্ম বিকাশ পায়। পরবর্তীকালে বৌদ্ধ দেবী হিন্দু ধর্মের উত্থানে হিন্দু দেবীতে পরিণত হয় ।

Image result for সাধক বামাক্ষ্যাপা

উওর মুখী আটচালা মন্দিরটি লাগোয়া ইঁটের তৈরি । ভিতরের দেওয়াল খুবই  মোটা।উপরের দিকে খিলান হতে একাধিক ধনুকাকৃতি খিলান উঠেছে ।মন্দির চূড়ায় একটি তামার পত্তাকাসহ ত্রিশীল তনটি পদ্ম ভেদ হয়ে উঠেছে । মন্দিরের উওর  পূর্বদিকে সীতা হরণ, অকালবোধন , রাম ও রাবণের যুদ্ধের দৃশ্য আর পশ্চিমদিকে কৃষ্ণলীলার ছবি আছে ।

তারার মূর্তিতে দেবী ভীষনা চতুর্ভূজা , মুণ্ডমালাধারিণী এবং লালজিহ্বা জিহ্বা বিশিষ্ট।দেবীর মাথায় রৌপ্যমুকুট থাকে । তবে বাইরের মূর্তি শাড়ি জড়ানো , গাঁদা  ফুলের মালায় ঢাকা ।মূর্তির মাথায় রূপোর ছাতা এবং কপালে সিঁদুর লেপা থাকে । চন্দ্রচূড়ায় মহাবেদ ,নির্মাণে জয়দও বণিক । মন্দিরটির মাঝারি আকারের গম্বুজাকৃতি ও তারা মন্দিরের পূর্বদিকে অবস্থিত ।

Image result for সাধক বামাক্ষ্যাপা

মা এখানে বলির প্রদও মাংসে ভোগী , তবে মা সনাতনী । মন্দির সংলগ্ন জীবিতকুণ্ড আরোগ্যলাভের স্থান আশ্বিন মাসের কোজাগরি শুক্লা চতুর্দশী তিথিতে মন্দির থেকে শিলামূর্তি নিয়ে পশ্চিমের বিরাম মঞ্চে এনে মাকে স্নান করানো হয় ।

Related image

শহরের এক কোণে নদীর ধারে তারাপীঠের শ্মশানটি অবস্থিত । শ্মশানটি শক্তিপীঠের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।মায়ের কাছে নর কঙ্কাল ও শ্মশান  খুবই প্রিয় । তন্ত্রসাধদের  ক্রিয়ার যথার্থ স্থান । তবু বাঙালী সনাতনী ভূমিতে স্বাচছন্দে কৃপাময়ী দেবীর সাথে তাঁর সন্তান বামদেবের নাম জুড়ে আছে , এখানেই জীবনী সার্থকতা।

Image result for সাধক বামাক্ষ্যাপা

 

 

শেয়ার করুন সকলের সাথে~
Rangoli Home Painting Solution

Be the first to comment

Leave a Reply