ভারতের অলৌকিক ও রহস্যময় ৫টি মন্দির

শেয়ার করুন সকলের সাথে...
  • 1.9K
    Shares

ভারতের অলৌকিক ও  রহস্যময় ৫টি মন্দির

 

ভারতবর্ষ তার ধার্মিক সুখ্যাতির জন্য বিশ্বে প্রসিদ্ধ । ধর্ম , ভক্তি ও বিভিন্ন চমৎকারে লীলাক্ষেত্র  আমাদের দেশ। বিশ্বাসেই মেলে ভগবান। এখানে এমন অনেক মন্দির আছে যার রহস্য উদ্ঘাটন করা বিজ্ঞানীদের পক্ষেও সম্ভব নয় ।  এখানেই বিষ্ণু অবতীর্ণ হন কৃষ্ণ  রূপে । এখানেই ঘটে সাইবাবার অলৌকিক লীলা। এখানেই রামকৃষ্ণর দর্শন হয় মা কালীর ।   হিন্দিতে একটি প্রবাদ আছে ‘ মন হ চঙ্গা, ত কঠতি উথ গঙ্গা  ‘। ভারতের মন্দিরে  মন্দিরে  লুকিয়ে আছে এমনি অনেক রহস্য ।

 

কামরূপ  কামাখ্যা

উত্তর পূর্ব ভারতের আসামের গুয়াহাটির নিকট নীলাচল পাহাড়ে কামাখ্যা মন্দির  অবস্থিত । পুরানে কথিত আছে মহাদেব  যখন মা সতীর  মৃতদেহ কাধে নিয়ে তাণ্ডব করছিলেন তখন বিষ্ণু নিজের চক্র  দিয়ে মা সতীর দেহ খণ্ড বিখণ্ড করেন । মা সতীর দেহ খণ্ড  যেখানে যেখানে পরে সেইসব স্থান গুলি শক্তিপীঠ হয়ে উঠে । তার মধ্যে প্রসিদ্ধ কামরূপ কামাখ্যা । এখানে দেবীর  যোনি দেশ  পড়েছিল । যোনিদেশ পড়েই  পাথরে রুপান্তরিত   হয়েছে । এই পাথরই  দেবী কামাখ্যা ।  দেবীর কোন মূর্তি নেই । দেবীর অধিষ্ঠান যোনি গহ্বরে।

কথিত আছে কেউ যদি এই শিলা স্পর্শ করে তাহলে দেবত্ব লাভ করে ।  নিল্কুট  পাহাড়ের উপর যেখানে দেবীর যোনি দেশ পরেছিল তার নাম  কুজিকা। এই মন্দিরে  আশ্চর্য  চমৎকার  হয় আষাঢ় মাসের  কৃষ্ণপক্ষের  অম্বাবুচির সময় । তিন দিন ধরে মেলা  চলে কামাখ্যায় । তিন দিন ধরে বন্ধ থাকে মার মন্দির ।  ঐ সময় মার যোনি দেশ থেকে  রক্তক্ষরণ হয় । লাল কাপড়  দিয়ে ঢাকা থাকে ঐ স্থান । আরও   আশ্চর্য  ব্যাপার হল মন্দিরের দরজা আপনা আপনি বন্ধ হয়ে যায় ঐ সময়  ।  এই মন্দিরে সবার কামনা পূরণ হয় তাই এই মন্দিরের নাম কামরূপ কামাখ্যা ।      

 

কারনি মাতা  মান্দির

ভারতের উত্তর প্রান্তে রাজস্থান  সংস্কৃতি ও ধার্মিক আস্থার  নগরী । বিকানের থেকে ৩০ কিলি মিটার  দূরে  দেশনক শহরে কারনি মাতার মন্দির অবস্থিত । রাজস্থানের একটি প্রসিদ্ধ তীর্থ স্থান । এই  মন্দিরের দর্শনার্থীরা মার দর্শনএর সাথে হাজার হাজার  ইদুরের দর্শন পান । অতি আশ্চর্য জনক দৃশ্য । মন্দিরের চারিদিকে হাজার হাজার ইঁদুরের সমাগম ।  দর্শনার্থীরা মার পূজার  জন্য ভোগ ও ইঁদুরদের জন্য লাড্ডু ও দুধ নিয়ে আসে  । দু রঙের ইঁদুর দেখা যায় ।বেশির ভাগ কালো ইঁদুর দেখা যায় তবে সাদা ইঁদুরের দর্শন পাওয়া  খুব বিরল । কথিত  আছে সাদা ইঁদুরের দর্শন যে পায় তার মনকামনা পূরণ হয় ।  কিন্তু একটা  প্রশ্ন  থেকেই যায় এত ইঁদুর কোথা থেকে আসে  ।    

কথিত আছে কারনি মাতা   ১৪৪৪ সালে ৭  আশ্বিন মাসে কৃষ্ণ পক্ষে  আবির্ভূত হন । বলা হয় মা দুর্গার  প্রতিরূপ মা কারনি দেবী  । মা যে গুহায় ধ্যান মগ্ন হতেন সেখানে ওনার শরির   যতীর লিঙ্গ  রূপে অধিষ্ঠান হয় । এখন  ঐ স্থান  মার মন্দির । কারনি মাতার বিবাহ হয় দেকাজির  সাথে । কিন্তু মা  কুমারী হয়েই থাকেন । মার  মর্জিতেই  ছোট বোন বাইর সাথে ওনার স্বামীর  দ্বিতীয় বিয়ে হয় । তারপর মার ছোট বোনের  চার সন্তানের জন্ম দেন । মা যখন ধ্যান মগ্ন হতেন   এই সন্তানেরা মার সেবা করতেন । আজও এই পরম্পরা চলে আসছে । এই জন্য তাদের বারিদার বলা হয় । ইঁদুর নিয়ে একটি কাহিনী কথিত আছে ।  মার ছোট বোনের ছোট সন্তানের নাম ছিল লক্ষণ রাজ । মার  সবচাইতে প্রিয়  পুত্র ছিল।  কিন্তু কুয়ায় পরে তার মৃত্যু হয় । মা তপস্যা করে যমের কাছ  থেকে তার প্রাণ ফিরিয়ে দিতে বল্লেন । যম লক্ষণের প্রাণ ফেরত দিল কিন্তু মনুষ্য রূপে নয় ইঁদুর রূপে । কথিত আছে মা কারনির বংশজ মৃত্যুর পর ইঁদুর রূপে জন্ম গ্রহন করে  এই মন্দিরে থেকে যায় । এত ইঁদুর থাকা সত্যে ও এই মন্দিরের প্রসাদ খেয়ে কারোর কোনোদিন ক্ষতি হয় নি । এই ইদুরেরা মন্দির প্রাঙ্গন ছেড়ে বাইরে কোন দিন বের হয় না। এরা  দর্শনার্থীদের কোন ক্ষতি করে না ।  যদি কোন ইঁদুর কারোর পায়ের উপর দিয়ে যায় তাহলে সেটা শুভ সংকেত মানা হয় ।  

 

মেহেন্দিপুর বালাজি মন্দির

রাজস্থানের তসার জেলায় অবস্থিত মেহেন্দিপুর বালাজি মন্দির ।  এই মন্দিরে এমন কিছু রহস্য আছে যার ব্যাখ্যা বৈজ্ঞানিকের কাছে ও নেই । এই মন্দিরে পূজিত বালাজি মহারাজ হলেন রাম ভক্ত  হনুমানজি । ওনার সঙ্গে আছেন প্রেত রাজ সরকার  ও কোতওয়াল   ভৈরব । প্রেত  রাজা ভুতদের দণ্ড দেন । ভৈরব  মহাদেবের আরেক রুপ । কথিত আছে প্রেত রাজা ও বালাজি মহারাজ আরাবল্লি  পর্বতে  প্রকট  হয়েছেন  ভূত , পিশাচ ও ব্ল্যাক মেজিকের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করতে । ভূত পিশাচ আক্রান্ত রোগীদের সুস্থ করে তোলেন এই মন্দিরের পুরোহিতেরা।  এই মন্দিরে প্রবেশ করলে  এমন কিছু দৃশ্য চোখে পরে যা দেখে আত্মা কেপে উঠে । কোন  মানুষকে যখন অশুভ  শক্তি নিজের বশে করে নেয়  তখন তাদের এই মন্দিরে নিয়ে আসা হয় । মন্দির প্রাঙ্গনে ঢুকতেই তাদের বীভৎস চীৎকার  শুরু হয় এবং তারা আপনা আপনি  তাদের ভিতরের অশুভ শক্তির  কথা বলতে থাকে । এই দৃশ্য  অত্যন্ত ভয়াবহ ।   

কিছু মানুষদের শিকল  দিয়ে বেধে রাখা হয় । আরও আশ্চর্য ব্যাপার হল যখন মন্দিরে সকাল সন্ধায় আরতি শুরু  হয় তখন  অশরীরী  আক্রান্ত মানুষেরা এসে জড়ো হয় । যাদের শিকল দিয়ে বেধে রাখা হয় তারা আপনা আপনি  উল্টো  হয়ে ঝুলে যায় ।   রোগী যদি  মহিলা হয় তিনি উলটে  থাকা  সত্যেও তার শরীরের কাপড় উল্টোয় না । বালাজি মহারাজের পূজার পর দুটি লাড্ডু   প্রসাদ রূপে দেওয়া হয় ঐ প্রসাদ রোগীকে খাওয়ানো হয় । তারা সুস্থ হয়ে আপনা আপনি বালাজি মহারাজের জয় বলতে থাকে ।  হানুমান চালিশার একটি লাইন  মনে পরে গেল “ ভূত পিশাচ নিকট নাহি আবে , মাহাবির যব  নাম শুনাবে “ । এই মন্দিরে  আস্তে হলে মাছ ,মাংস, মদ্যপান, পেয়াজ ও  রসুন  খাওয়া যায় না । স্থানীয়দের কথায়  বাড়ি থেকে বেরবার আগে বালাজি মহা  রাজের কাছে প্রার্থনা করতে হয় যাতে  দর্শনার্থী  সুস্থ  শরীরে  বাবার দর্শন পায় । ঠিক একইভাবে  বাড়ি ফেরার জন্যও,  তারপর এক মুহূর্ত ঐ জায়গায় থাকতে নেই। সাধারণত আমরা পুজ করে বাড়ি প্রসাদ নিয়ে আসি । কিন্তু এই মন্দিরে ক্ষেত্রে ঠিক তার উল্টো , বাবার মন্দিরের প্রসাদ সেখানেই খেয়ে  আসতে হয়  এবং যদি কিছু  প্রসাদ বাকি থাকে তা মন্দিরের বাইরে পশু-  পাখিদের দিয়ে দিতে হয় । এমনকি  সঙ্গে নিয়ে যাওয়া  ক্রিম ও  পাউডার পর্যন্ত  বাড়ি ফেরত আনতে নেই । আরেকটি  প্রয়োজনীয় তথ্য এই মন্দির সম্পর্কে এই মন্দিরে প্রবেশ করার পর কেউ যদি  পিছন থেকে ডাকে তাহলে পিছন ফিরে তাকাতে নেই ।  কারন সেই  ডাক  কোন পরিজনের নয় অতৃপ্ত আত্মাদের । অশুভ শক্তি  সবসময় কাউকে না কাউকে বশ করার জন্য উদবিগ্ন হয়ে থাকে । 

 

কাল ভৈরব মন্দির

মধ্যপ্রদেশে  অবস্থিত উজ্জয়িনি  শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে কাল  ভৈরব মন্দির অবস্থিত । পুরানে কথিত আছে মহাদেবের রক্ত থেকে  ভৈরব এর জন্ম । এই  রক্ত দুটি ভাগে বিভক্ত হয় । একজন বটুক ভৈরব এবং  অন্যজন কাল ভৈরব । বটুক ভৈরব মহাদেবের বাল্যরূপ  । কাল ভৈরব মহাদেবের যুবকরূপ । ব্রহ্মদেবের অহঙ্কার মোচনের জন্য  কাল ভৈরব ব্রহ্মার পঞ্চম মস্তিস্ক ছেদন করেন । তখন বাবার উপর  ব্রহ্মহত্যার পাপ লাগে । তার  প্রায়শ্চিত্ত করতে   তিনি অবন্তিকায়  আসেন । শিপ্রা  নদীতে স্নান করে তপস্যায় বসেন । তারপর মহাদেবের ব্রহ্মহত্যা থকে মুক্তি পান ।এই স্থান পরবর্তী কালে কাল ভৈরব মন্দির হয় । এই মন্দিরের চমৎকার হল কালভৈরবকে   ভোগ হিসাবে দর্শনার্থীরা মদ   অর্পণ  করে  ।

বাবা ঐ মদ পান করেন ।কি করে এটা  সম্ভব এক মাত্র ভৈরবনাথ জানেন । ভৈরবনাথকে যখন ভোগ নিবেদন করা হয়  তখন তিনি ঐ মদ পান করেন । কথিত আছে নিবেদিত ভোগকে বিশেষ ভাবে মন্ত্রপূত করা হয় ।  তারপর বাবাকে পান করান হয় । কথিত আছে ভৈরবনাথ যদি মদ পান করেন তাহলে দর্শনার্থীর মনবাসনা পূর্ণ হয় ।

শনির দশা থেকে মুক্তি পাবার  একমাত্র উপায় এই  কা ভৈরব -এর পূজা । যেভাবে সব দেবতাদের পূজার দিন নিশ্চিত থাকে  সেভাবে ভৈরবনাথের পূজার দিন  রবিবার ও মঙ্গল বার । কাল ভৈরব -এর এই মন্দিরকে  তান্ত্রিক পীঠও বলা হয় । ভৈরবনাথ প্রতি বিশ্বাসই দর্শনার্থীদের টেনে  নিয়ে আসে  এই মন্দিরে ।  

 

কন্যা কুমারী  দেবী মন্দির

দক্ষিণ ভারতের কন্যা  কুমারীতে তিনটি সমুদ্রের  মিলন স্থলে মা পার্বতীর  এই  মন্দির অবস্থিত । এখানে মা পার্বতীর কুমারি রূপে বিরাজমান  ।  আরব  সাগর , বঙ্গপোসাগর ও ভারত সাগরের মিলন স্থলের প্রাকৃতিক  সৌন্দর্য  অত্যন্ত আকর্ষণীয় ।এই মন্দিরে পুরুষ দর্শনার্থীদের কোমর  থেকে উপরের বস্ত্র ত্যাগ করে মন্দিরে প্রবেশ করতে হয় ।  পুরানে কথিত আছে   মা পার্বতী দেবাদিদেব  মহাদেবকে স্বামী রূপে পাওয়ার জন্য এখানে তপস্যা করেন । মহাদেব মার তপস্যা প্রসন্ন হয়ে  মা পার্বতীকে বিবাহের   প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন । কিন্তু  এদিকে  বানাসুর নামে এক অসুর দেবতা ও মর্তবাসিদের  জীবন দুর্বিষহ করে তোলে, ব্রহ্মার বর অনুযায়ী একমাত্র কুমারি নারী তাকে সংহার করতে পারবে । অন্যদিকে মার বিবাহের আয়োজন চলছে । কিন্তু এই বিবাহ হলে বানাসুরকে  সংহার করা সম্ভব নয় । তাই দেবতারা নারদ  মুনির  পরামর্শে  বিবাহের সময়  নির্ধারণ করেন । শেষ রাত্রে বিবাহের সময় নির্ধারণ করা হয় । মহাদেব সময় অনুযায়ী দেবীকে বিবাহের উদ্দেশে  যাত্রা শুরু করলেন । যখন তিনি বাল্যকাপুরম পৌঁছান তখন নারদ মুনি এক মোরগের বেশ  ধরে উচ্চস্বরে চিৎকার শুরু করেন। ঐ আওয়াজ শুনে মহাদেব ভগ্ন হৃদয়ে  চলে যান  । তখন মা পণ করেন তিনি চিরকুমারী হয়ে থাকবেন।   বিবাহের জন্য  যে  চাল  ও ডাল   আনা হয়েছিল তা এই সমুদ্র তটে ফেলে দেওয়া হয় । পরে এই চাল ডাল কাঁকড়ে রূপান্তরিত হয় ।

আজও এই সমুদ্র তটে চাল ও ডালের আকারে ছোট ছোট পাথর দেখা যায় । দেবীর নামেই এই স্থানের নাম কন্যাকুমারী । এই দিব্য কাহিনীর সাক্ষী হয়ে আছে এই  সমুদ্র তট ।  

 

কথায় আছে বিশ্বাসে ভগবান তর্কে বহুদূর । এই লেখাটি কোনও রকম অন্ধবিশ্বাস কে প্রশয় দিয়ে নয়। আপনাদের বিবেচনার উপর আমাদের সম্পূর্ণ আস্থা রইল।  

Facebook Comments

শেয়ার করুন সকলের সাথে...
  • 1.9K
    Shares

Sponsored~

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.