খবর ২৪ ঘন্টা

রহস্য ও রোমাঞ্চের মিশেল “ফরেন্সিক সায়েন্স”~ শিক্ষার এক অভিনব দিক……

শেয়ার করুন সকলের সাথে...

WEB dESK:    সিআইডি সিরিয়ালের ড. সালোঙ্কের কথা নিশ্চয়ই সকলেই জানেন। যার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার উপরে ভর করেই কঠিনতর অপরাধের কিনারা সম্ভব হয়। তার করা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশ্লেষণের জন্যই এসিপি, দয়াল আর অভিজিৎ বার বার অপরাধের কিনারা করতে পেরেছে। তবে এসবের মূলে কাজ করে বিজ্ঞান, যার সাহায্যেই সঠিক ও নির্ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছান ডা. সালোঙ্কে। সেই বিজ্ঞানের নামই হল ফরেন্সিক সায়েন্স

একজন ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞের পেশা যতটা গুরুত্বপূর্ণ তার চাহিদাও দেশে বিদেশে ততোধিক। দুই বিপরীত মেরুতে অপরাধ আর ফরেন্সিক সায়েন্স। তবু তাই বিশ্লেষণের সময় বিজ্ঞানের হাতিয়ার হিসেবেই কাজ করে। এ এক নিবীড় যোগসূত্র দুই জনের ভিতরে। যতদিন অপরাধমূলক কাজকর্ম চলতে থাকবে এই পেশার চাহিদাও বাড়বে ততদিন। ইতিহাসবিদরা তো বলেন অপরাধ মানব জীবনেরই অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তাই বিজ্ঞান শাখার শিক্ষার্থীরা এই বিষয়টিকে পেশা হিসেবে নিতেই পারেন।

কাজের প্রকৃতি…

ফরেন্সিক সায়েন্স আসলে বিজ্ঞানের একটু গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যা আমাদের ঘটমান সমস্ত অপরাধের তদন্ত করতে সহায়তা করে। একজন ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ অপরাধের স্থান থেকে সংগৃহীত তথ্য প্রমাণাদির উপর নির্ভর করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছান। যেমন আমরা কিছুদিন আগেই বিক্রম বেতালের গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট কেসটা দেখলাম। ফরেন্সিক সিদ্ধান্ত থেকেই পরবর্তীতে তদন্ত এগিয়ে চলে। শুধু তাই নয় ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞের বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত বিচারের সময় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবেই বিবেচিত হয়।

ফরেন্সিক সায়েন্স সম্পূর্ণরূপেই ক্রাইম-ল্যাব নির্ভর কারজ। যে কোনও অপরাধের সঠিক মূল্যায়ণ করতে, অপরাধীকে ধরতে এই ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ তাই দরকার। অপরাধের স্থানে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর থেকে পাওয়া বিভিন্ন জিনিস যেমন – রক্ত, দেহরস, জামাকাপড়, হাতের ছাপ, অপরাধীর ব্যবহার করা বস্তু প্রমুখ থেকে সংগৃহীত তথ্যের নিরীখে ফরেন্সিক বিশেজ্ঞরা তাদের রিপোর্টি তৈরি করেন। আর এই রিপোর্টের মাধ্যমেই অপরাধীকে চিহ্নিত করা সম্ভব। বিচারাধীন অবস্থায় এই নথি গুরুত্বপূর্ণ ভাবেই পেশ করা হয়। তাই অপরাধীকে ধরতে এই বিজ্ঞানের উপর নির্ভর করতেই হয়।

তিনটি ভিন্ন বিভাগ রয়েছে এখানে – ল্যাবরেটরি সায়েন্স, ফিল্ড সায়েন্স ও মেডিক্যাল সায়েন্স। ল্যাবরেটরি সায়েন্সের মধ্যে রয়েছে কেমিস্ট্রি, বায়োলজি, ফিঙ্গার প্রিন্টস প্রভৃতি। ফিল্ড সায়েন্সের মধ্যে রয়েছে – অপরাধ যেখানে হয়েছে সেই স্থানের তদন্ত। যেমন – যেখানে খুন হয়েছে বা কোথাও বিস্ফোরণ ঘটেছে সেই স্থানের তদন্ত। অন্যদিকে মেডিক্যাল সায়েন্সের মধ্যে রয়েছে ফরেন্সিক প্যাথোলজি, সাইকোলজি। ফরেন্সিক সায়েন্সের সাম্প্রতিক শাখা হল ফরেন্সিক স্পিচ সায়েন্স। এই সায়েন্সে স্পেকট্রোগ্রাম যন্ত্রের সাহায্যে রেকর্ডিং করা এবং ভয়েস স্যাম্পেল বিশ্লেশণ করে বক্তাকে চিহ্নিত করা যায়। ফৌজদারী ও দুর্নীতিমূলক মামলায় ভয়েস স্যাম্পেলকে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবেই পেশ করা হয় আদালতে।

শিক্ষাগত যোগ্যতা…

বিজ্ঞান শাখার শিক্ষার্থীরাই এই বিষয়ে পড়তে পারেন। উচ্চমাধ্যমিকের পর এই বিষয়ে বিএসসি কোর্স করা যেতে পারে। এছাড়া স্নাতক হওয়ার পর ফরেন্সিক সায়েন্স ও ক্রিমিনোলজিতে ডিপ্লোমা কোর্স করা যায়। এই কোর্সটি এক বছরের। এই বিষয়টি নিয়ে স্নাতকোত্তর স্তরে পড়তে হলে স্নাতক স্তরে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, জুলজি, বোটানি, বায়োকেমিস্ট্রি, মাইক্রো বায়োলজি, বি-ফার্ম প্রভৃতি বিষয়ের যে কোনও একটিতে ফার্স্ট ক্লাস পেতেই হবে।

কেন মৃত্যু ঘটেছে বা পোস্টমর্টেমের উপর বিশেষ কোর্স করতে আগ্রহীদের এমবিবিএস ডিগ্রি পাশ করার পাশাপাশি ফরেন্সিক সায়েন্সে এমডি করতে হবে। অন্যদিকে ফরেন্সিক সায়েন্স নিয়ে গবেষণা করতে চাইলে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি. অ্যানথ্রোপলজী, জুলজি, মাইক্রো বায়োলজি, কম্পিউটার সায়েন্স, ফরেন্সিক সাইকোলজি ইত্যাদি বিষয়ে স্নাতকোত্তর স্তরে ফার্স্ট ক্লাস সহ পাশ করতে হবে। অথবা এর যে কোনও একটিতে এমফিল করা থাকলেও পি.এইচ.ডি করা যাবে।

দক্ষতা…

কাজের খুঁটিনাটি এবং যথার্থতা বিষয়ে জানা থাকা এই পেশাকে আপন করে নেওয়ার প্রধান শর্ত। প্রখর বুদ্ধি ও সুশৃঙ্খলা থাকা দরকার। প্রতিটি বিষয়ক বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করার ক্ষমতা, অনুসন্ধিৎসু স্বভাব, দলগতভাবে কাজ করার মানসিকতা, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা থাকা দরকার। ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞের কাজটি আকর্ষণীয় ও রোমাঞ্চকর মনে হলেও তা সবাইকে স্যুট করবে না। আসলে এখানে সব সময় সতর্ক থাকতে হয়। একটু ভুল হলে ব্যর্থতা। নানা কারণে অদ্ভুত ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা এই পেশার কাজ হবে মৃত মানুষ, রক্ত ও ভয়ঙ্কর সব অপরাধকে নিয়ে। এসবের জন্য সকলে প্রস্তুত থাকে না। তাই যারা এসবের মধ্যে কাজ করতে পারবেন বলে আত্মবিশ্বাস রাখেন তারাই এগিয়ে যেতে পারেন।

কাজের সুযোগ…

রাজ্য ও কেন্দ্রিয় সরকারের পুলিশ বিভাগ, সরকারি ও বেসরকারি গোয়েন্দা সংস্থা, স্টেট ফরেন্সিক বিভাগ, লিগ্যাল সিস্টেম প্রভৃতি স্থানে কাজের সুযোগ রয়েছে। বেশিরভাগ সময়ই পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষার মাধ্যমে প্রার্থী নিয়োগ করা হয়ে থাকে। রাজধানীর ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষার মাধ্যমে সিবিআই-এর ফরেন্সিক ল্যাবরেটরি বিভাগে নিয়োগ করা হয় প্রার্থী। এছাড়াও ভিজিলেন্স বিভাগেও ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞদের কাজের সুযোগ রয়েছে।

কোথায় পড়ানো হয়…

কলকাতা ও অন্যান্য রাজ্যের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

যোগাযোগের ঠিকানা….

১। সেন্ট্রাল ফরেন্সিক ল্যাবরেটরি, কলকাতা

সি.এফ.আই.এস. কমপ্লেক্স

৩০, গোরচাঁদ রোড, পার্ক সার্কাস, কলকাতা – ৭০০ ০১।

 

২। আর জি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

১, ক্ষুদিরাম বোস সরণি, কলকাতা – ৭০০ ০০৪।

 

৩। ইনটেন্স ফরেন্সিক সার্ভিসেস ইন্ডিয়া (আই.এফ.এস.)

সি-২/১৬, প্রথম তল, জনকপুরি, নতুন দিল্লি – ১১০০১২

 

৪। ইনস্টিটিউট অব ফরেন্সিক সায়েন্স অ্যান্ড ক্রিমিনোলজি

ফার্মাসি এক্সটেনশন ব্লক

সেকেন্ড ফ্লোর

পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটি,

সেক্টর – ১৪, চন্ডিগড়, ই.টি – ১৬০০১৪

Facebook Comments

শেয়ার করুন সকলের সাথে...