খবর ২৪ ঘন্টা

মধ্যবিত্তের মধ্যপ্রদেশের ~ সোমাদ্রি সাহা

শেয়ার করুন সকলের সাথে...

মধ্যবিত্তের মধ্যপ্রদেশের

সোমাদ্রি সাহা 

*************************

 

আয়ুকাল শুধু পাগলিকেই খুঁজে চলা

পাগলির সাথেই মনের কথা বলা…

মধ্যবিত্ত আর মধ্যপ্রদেশের মধ্যে সম্পর্ক চিরকালীন। বাঙালির রয়েছে ভাত, মাছ আর পেট। মানে মধ্য-প্রদেশ। তেমনই ভারতবর্ষের মধ্যভাগের প্রকৃতি শোভা হৃদয় মননের অনবদ্য এক মধ্যপ্রদেশ। তারই কিছু টাটকা স্মৃতি… আমার মননের পাতায় স্তরিভূত। পাঠক তো ভালো কিন্তু এই অপদার্থের কলমের জোর দিন দিন কমছে। তাই মনের কষ্টরা সেখানে বাসা করে রয়েছে। লুকিয়ে থাকা সেই মন-জমিনের অন্তঃস্থলে চিকচিক করে উঠছে কিছু মুহূর্ত। কিছু নারীর চোখ, কিছু হাসি, কিছু টুকরো টুকরো কথা…যা শুধুমাত্র কবিতা…

আমার ভ্রমণ গন্তব্যে ছিল পাঁচটি স্থান। পাঁচমাঢ়ী, জব্বলপুর, অমরকন্টক, বান্ধবগড় ও খাজুরাহো। যদিও নেট দুনিয়ায় এ সমস্ত স্থানে কী রয়েছে তা ভিডিওতে সকলেরই জানা। আমি নিজেও সেই বিস্তারিত কথা লিখে একাধিক তথ্য দিয়ে বিরক্ত করতে চাই না। আমি কাব্য মনজমিনে যা সঞ্চয় করলাম তারই কিছু স্মৃতি এখানে ব্যক্ত করছি…

পাঁচমাঢ়ীতে পৌঁছে গেলাম কী করে তাই ভাবছি। বেড়ানোর আগেই তো নাটকের ক্যাটাসট্রফি হয়ে গিয়েছিল। পুরো ক্লাইম্যাক্স। ভারতীয় রেল বাতিল করেছিল ১৮৬টি ট্রেন। তার মধ্যে এই অপদার্থের ট্রেনটিও ছিল। তবু তৎকাল ভরসা।

কিছু সংশয়, কিছু নিয়ম পেরিয়ে এলেই মুক্তি

মধ্যপ্রদেশ যাচ্ছি অবশেষে, সেটাই মনের শক্তি

 

পরের দিন ভোরের দুরন্তের টিকিট জুটে গেল। আর তাই দুরন্ত গতিতে বিলাসপুরে পৌঁছাতে সন্ধ্যে ছটা, তারপর সংযোগকারী পরের ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করা। রাতের অমরকন্টকের বিভৎস ঠান্ডার কামড় খেতে খেতে আমেজময় শীত মরসুমে পাগলিকেই খুঁজেছি। সকাল সাতটায় পিপারিয়া স্টেশন। তারপর মা নর্মদার বিভিন্ন রূপ বৈচিত্র, ধাবা, পাহাড়ি পথ পেরিয়ে ট্রেকার গাড়ি করে পাঁচমাঢ়ী।

 

 

(১)

শীতের আমেজ। মরসুমের কম্বলের অন্য বিছানা। তাই ঘুম হয় না বেড়াতে গিয়ে। শুয়ে আছি। হোটেলে। ভালো লাগছে না। বেরিয়ে পড়লাম রাস্তায়। জব্বর সমস্ত ঠান্ডার আসবাব আমার শরীরে, রাস্তায় কাঠের আগুনের তাপ নিচ্ছে কিছু লোক। ভোরের কয়েক রাউন্ড চায়ের জল উদরস্ত হয়েছে প্রাতঃ ভ্রমণকারীদের। আমি আবার অপদার্থ। নো নেশা। চা খেলে অ্যাসিটিক কেলো। তাই হাঁটছি। মনে হচ্ছে এই পাহাড়ি পথ বড়ই পরিচিত। এক পাল গরু ও ষাঁড় আসছে ঘন্টার আওয়াজ করে। হেড অফিসের বড় বাবু। একটি তো আরেকটু হলে আমাকে গুঁতিয়ে দিচ্ছিল। আমি চুপ। হাঁটছি। সামনেই মিলিটারিদের কলেজ। ছবি তুলব কী…এখানে নিষেধ। তবু লুকিয়ে দু’একটা ক্লিক করেই দিলাম। সব কী মনেতে থাকে। ছাতার মাথা। উফ্ ঠিক তখনই বাঁদরগুলো খিঁচিয়ে এলো। আমি যে ওদের উত্তর পুরুষ বুঝে নিল। খাবার চায়।

সামনে মর্নিংওয়াকে চলেছে লম্বা এক পুরুষ ও একটি কম বয়েসি মহিলা। মহিলা ঠিক নয়, মেয়েটিকে আমার সাথে ভালই মানায়। কাশ আমিও আর্মিতে থাকতাম। এত সুন্দর দেখতে মেয়েটি…চোখ, ঠোঁট। তখনও সূর্য আলো দেয়নি প্রত্যুষের। তাই ভালো করে আর ঐ নারীর সাথে আলাপটাই হল না। দূর থেকে লেকে ফুটে থাকা শালুকের ছবি কবিতার মতোই সমুজ্জ্বল। রাস্তা দিয়ে চলেছে সৈন্য ছাত্রদের প্রশিক্ষণ। ঐ ভোর। ঐ ঠান্ডা। ব্রিগেডিয়ার, মার্শালরা যেমন প্রাতঃভ্রমণ করছে ঠিক তেমনি অপরদিকে সৈন্যরা এক পাক করে দৌড়ে আসছে। এসে পুস আপ। বেঞ্চ প্রেস। কত কিছু সব বলতে নেই। ভারতমাতার নাগরিক আমি। বাকিটা হৃদয়েই থাক। আর সাক্ষী হয়ে থাক এই অঞ্চলের চার্চ। আমার কপাল খারাপ, রবিবার ছাড়া সেই চার্চে খুলবে না। আমি প্রবেশ করতে পারলাম না। তবে পাঁচমাঢ়ী কথা দিলাম আমি আসব। ঐ সকালের রাস্তায় যে অভুক্ত ছোট্ট মেয়েটি তিনটি গরু নিয়ে যাচ্ছিল বাবার সাথে, হয়তো চাষ জমি রয়েছে অদূরে…আমার চোখ তো সর্বত্র যায় না, ঐ মেয়েটিকে আমি আবার দেখতে চাই, ও ততদিনে নিশ্চয়ই পড়াশুনো শিখবে। আসলে পাহাড়ি অঞ্চলে পর্যটন ও পশুপালন জীবিকা। চাষ হয় পাথুরে জমিতে খুব কম। আমি আসব নারী তোমার বাবার অজান্তে তোমায় আদর করব ব্রিগেডিয়ারের কন্যা। আমি আসব বি-ফলস। আমার পাগলির সাথে কাটিয়ে যাব এক মন কেমনের সকাল। আমি আসব গুপ্ত শিব, বরা শিব….বলছি তো সুসাইড পয়েন্টে গেলেও সেখানে দাঁড়িয়ে পাগলিকেই চুমু খাবো। আকাশে উড়ে প্যারাগ্লাইডিংয়ের শখ নেই। কারণ খুবই কম পরিসরে পরিস্থিতি ঠিক লাগছিল না। বলতে পারেন বড়লোকের ব্যবসা। তবে বিনোদনের তো অনেক রং। পাঁচমাঢ়ীর গুহাচিত্র সে সবই মনে করিয়ে দেয়। এতো সুন্দর করে ছবি আদিম যুগে গুহায় এঁকেছিল কোনও এক নারীর জন্য কোনও পুরুষ….জানত না সেলফি তুলতে আসবে এই আনাড়ি…ছায়া পেরিয়ে সূর্য অস্ত যাচ্ছে ঐ দূর উপত্যকায়। আমি জিন্সে লাল মাটি মাখালাম। সূর্যের আলো ছায়ায় ঐ অরণ্যে ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে আসছে….আমার পাগলি তো এসব দেখতে পেলো না। পাগলি আমি আসছি….পাঁচমাঢ়ীর দোকান বাজার সে কথাই তো বলছে। বিশাল চত্বর। মন্দির মসজিদ চার্চ…ধর্ম এখানে চুপ। এখানে যে শুধুই পাহাড়ের অনুশাসন। নারীময় ধরিত্রীতে এক অভিসার, সুন্দর আইলাইনার পরিহিত দ্রোপদীর চোখ পঞ্চপান্ডবের গুহায় বসে শুধু সে কথাই শুনছে…তবে একটাই দুঃখ এখানকার কালো কুল নিজেই খেলাম জিভে টোকা দিয়ে…আরেকটু নুন ও পাগলি থাকলে বিষয়টা জমে যেত।

 

(২)

পাঁচমাঢ়ী হল মধ্যপ্রদেশের দার্জিলিং। সেই পাহাড়ি পথ ধরে সাপের মতো নেমে এলাম ঠান্ডাকে হৃদমাঝারে নারীর চোখ নিয়ে পিপারিয়া স্টেশনে। ইন্টারসিটিতে উঠলাম। ফাঁকা ট্রেন। চেয়ার কার। মাঝে মাঝেই থামছে। রোদের আলতো ছোঁয়া আমার নরম ঠোঁট স্পর্শ করছে। বুঝতেই পারছি পাগলি নেই। ঠিক সেই সময়…আবার এক অফিস যাত্রী। রোজ রোজ ডেলি প্যাসেঞ্জারি করে। আমার দাদা তো খোশ গপ্প জুড়ে দিল। নিজেও যে ডেলি প্যাসেঞ্জার, রোজ রোজ। তাই সহযাত্রী বলাই চলে। ধুর, যা বলছিলাম – এক সুন্দরী উঠল। গিয়ে বসল আমার মায়ের পাশেই। আমি পাত্তা দিলাম না। সেও মিচকি হাসি দিল। আর আমিও পাঁচমাঢ়ী থেকে পুরো জব্বলপুর। মাঝে মহিলাটিকে চেকার পাকড়াও করল। বেমালুম হাসতে হাসতে বিশ টাকা ফাইন দিল। আসলে ওখানে তো আমাদের মতো সোনারপুর লোকাল নেই। তাই অফিস যাত্রীরা, সরকারি পদস্থরা এ ভাবেই যাতায়াত করে। নারী আমায় টাটা না করেই নেমে গেল। কী সাহস, আমার মাকে বলল “আন্টিজি হ্যাপি জার্নি…” আমি গাল বাড়িয়ে দিলুম…কিন্তু সে ভ্যানিস। পাগলি নেই তো, তাই একটু….পাগলি এসব পড়ে আমায় মারবে নাকি…আমি তো … সুবোধ অপদার্থ।

জব্বলপুরের হোটেলে গরম জল। স্নান হল ভালো করে। আমায় দাদা বৌদি নাম দিয়েছে হেগো। ভাইপো, ভাইঝি বলছে ব্রাশটা নাকি বাড়িতে রেখে এসেছি। তাই একটু কেতাদরুস্ত হয়ে খেয়ে উঠেই অটো ঠিক করলাম। যাব। কোথায়….কেল্লা দেখতে। রানি দুর্গাবতীর কেল্লা। ইতিহাস এখানে কথা বলে। এখানে নতুন করে ভাবনারা কথা বলে ওঠে, বিস্তৃত শহর সুন্দরভাবে খেলনা বাড়ির মতো দেখা যায়। সত্যই কেল্লা। কয়েকটি যুগল প্রেম করছে। নির্জনে। আমি স্বভাবসিদ্ধ ভাবেই ছবি তুললাম। নিচে একদিন মাজার ছিল, পেরিয়ে উঠে এলাম কেল্লায়। পাথুরে পথে পায়ে হোঁচট খেয়েছিলাম। তবু ক্যামেরাটি ভাঙেনি। ভাগ্যিস, তাই এতো আদিম ঐতিহাসিক কেল্লা দেখতে পেলাম। পাশ দিয়ে নেমে গেলাম ব্যালেন্সিং রক দেখতে। সেখানে দুর্গা, শিব, হনুমানের মন্দিরও রয়েছে। সবই দেখে এলাম তালাব সহ। ঐ পাহাড়ি পথ নাকি ঘোড়ায় পেরিয়ে উঠে যেত। ঐ রানি সত্যই পাগলি ছিল বটে। সেই পাহাড়ি পথ ধরে নেমে এলাম। সেই সুন্দর ভাবনা ধরে সন্ধ্যা নামল জব্বলপুরের রাস্তায়।

মুসলমান এক কিশোর হিন্দু মন্দির ও ইতিহাস শেখায়

বিদেশি থেকে আমার বদলে যায় চোখ, কাব্য লেখায়

ভারতের মধ্যপ্রদেশের শিল্পশহর জব্বলপুর, যা আসলে জব্বলপুর নামের পরিচিত। আরবি ভাষায় ‘জব্বল’ শব্দের অর্থ পাথর। জব্বলপুর হলো পাথুরে শহর। বিচিত্র আকৃতির ক্ষয়িঞ্চু পাথরের পাহাড় তার চারদিকে। এক সময় এখানে ছিল কালচুরি আর গোন্ড রাজাদের রাজধানী। শহরের একধারে রয়েছে গোন্ড রাজাদের তৈরি মদনমোহন দুর্গ। পাহাড়তলির পরিচ্ছন্ন বসতি ছাড়িয়ে টানা চড়াইপথ উঠে গিয়েছে চূড়া পর্যন্ত। কোথাও সিঁড়ি, কোথাও ঢাল। পাহাড়ের উপর মদনমোহন কেল্লা, রানি দুর্গাবতীর প্রাসাদ সময়ের আঘাতে ভেঙে পড়েছে। বারো শতকে গোন্ড রাজারা এখান থেকেই শাসন করতেন তাদের গোন্ডয়ানা রাজ্য। দুর্গ দেখে পাহাড়ের মাঝামাঝি নেমে এলে হাতের বাঁ দিকে পড়বে শিবের মহামন্দির। গুহাটা অনেকটা ছোটখাট ঘরের মতো, তার মাঝে প্রতিষ্ঠিত শিবলিঙ্গ।

নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হলেও আমি দুর্গের কান্না হাসি শুনেছি

ঘুঙুর পায়ে চলেছে এগিয়ে, সে কথাই নতুন করে জেনেছি

 

সন্ধ্যের মার্কেটিং হল…রাত পর্যন্ত। অনেক সুন্দর চেতনা জড়ানো সোয়েটার টুপি আর সেই নারী চোখ। এখানে আবার নারীরা বেশ আধুনিকা। স্কুটার চালায়। এটাই তো উচিৎ। রাতের কুয়াশা ঠান্ডা কম্বলের আদরে আলাদা করে বুঝিনি। সকাল হল। আবার চলো। বেড়িয়ে পড়লাম। চৌষট্টিযোগিনী মন্দির। অপূর্ব মন্দিরের কারুকার্য। অনেক মায়ের মূর্তি ভগ্নপ্রায়। আমার এক গণেশ দাদাকে দেখে খুব কষ্ট হল। কি আর করা ছবি তুলে নন্দিকে টাটা করে চলে এলাম ইতিহাসের দ্বার পেরিয়ে। এতো সুন্দর কারুকার্য বালি পাথরের উপর নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কেন জানি না, আসলে ইনক্রেডিবেল ইন্ডিয়া যে… ইতিহাসের ঐতিহাসিক এক চেতনা। এক মুহূর্ত যাপন চুপ করিয়ে দেয়।

চৌষট্টি যোগিনী মন্দিরটি ভারতের অন্যতম একটি ঐতিহাসিক স্থান। এটি দশম শতকে কালাচুরি রাজত্ব কালে নির্মিত। মন্দিরটির গঠন অনেকটা খাজুরাহের মন্দিরগুলোর মতই। মন্দিরটি দুর্গা দেবী এবং তাঁর ৬৪ জন যোগিনীর উদ্দেশ্যে নির্মিত। মন্দিরটি নর্মদা নদীর কুলে অবস্থিত। মন্দিরের কাছেই ভেদাঘাট মার্বেল পাথরের পাহাড় অবস্থিত। মন্দিরটি মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে। বর্তমানে মন্দিরের বেশ কিছু অংশ ধ্বংস প্রাপ্ত যা মুঘল রাজারা ধ্বংস করেছে। এ মন্দিরটির নির্মাণ কাল দশম শতকে। ধারণা করা হয় কালাচুরি রাজারা এটির নির্মাণ করেছেন। মন্দিরে নির্মাণ গ্রানাইট শিলা দিয়ে। মুঘল রাজত্ব আমালে মুঘল লুটপাটকারীরা মন্দিরের অনেক ক্ষতিসাধন করেছে। মন্দিরটি পাহাড়ের শীর্ষে নির্মিত। মন্দিরে পৌঁছাতে হলে ১৫০ ধাপ সিঁড়ি অতিক্রম করতে হয়। সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের কালে যখন আলোকরশ্মি মন্দিরের উপর পরে তখন মন্দির এবং মন্দিরের অভন্তরস্থ মাতা পার্বতী ও শিব মূর্তি দেখলে এক স্বর্গীয় অনুভূতি সৃষ্টি হয়। এছাড়া মন্দিরে মহাদেবের ষাঁড় নন্দীরও মূর্তি রয়েছে। এছাড়া সমস্ত মন্দিরে বৃত্তাকার ভাবে ৬৪ জন যোগিনীর মূর্তিও খোদাই করা রয়েছে যারা প্রত্যেককে ভিন্ন ভিন্ন ভঙ্গিমায় দেখানো হয়েছে।

জব্বলপুর শহর থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে ভেড়াঘাট। যেখানে প্রকৃতির কয়েকটি ভয়ঙ্কর সুন্দর সৃষ্টি দেখার জন্য ভিড় করেন দেশ-বিদেশের বহু মানুষ। পাথরে বাঁধানো চওড়া রাস্তা পৌঁছেছে নদীর ধারে। পথের শেষে ধুঁয়াধার জলপ্রপাত। স্থানীয় মানুষের কাছে গঙ্গার মতো পবিত্র নর্মদা নদী এখানে জলপ্রপাতের রূপ নিয়ে, পাথরের এক ধাপ থেকে আরেক ধাপে আছড়ে, অনেক নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। তাতে বহু দূর পর্যন্ত ধোঁয়ার মতো জলকণা উড়ছে বলেই নর্মদা প্রপাতের আরেক নাম ‘ধুঁয়াধার’ জলপ্রপাত। দাঁড়িয়ে থেকে সেই প্রপাত দেখার জন্য নিরাপদ দূরত্বে নদীর উপর রেলিংঘেরা ভাসমান প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছে। বৃষ্টির মতো উড়ন্ত জলকণা প্রতিনিয়ত এসে ভিজিয়ে দিয়ে যাবে শরীর। কয়েকশো মিটার দূরে আরেকটি টিলার উপরে রয়েছে আরেকটি ভিউ প্ল্যাটফর্ম। এক অনন্য শাহরুখ অভিজ্ঞতা। রামধনু এতো সুন্দর ভাবে ফলসে দেখা গেছিল যে ভাবাই যায় না। আসলে পাগলি না থাকলেও ফলস আর রামধনুতে দিলওয়ালে হওয়াই যায়। তার উপর আকাশ পথে রোপওয়ে থেকে যা দেখলাম মনে হয় সীতাও রাবণের সাথে যেতে যেতে এই শোভাই দেখেছিল…

আমার কবিতার যেমন অপমৃত্যু হয়, তেমন মৃত্যু মার্বেল রকের নৌকো বিহারে হল না। অপূর্ব, অনবদ্য যে কমেন্টে আমরা অভ্যস্ত তাই বলতে ইচ্ছে করছিল নৌকোতে উঠে। নানা টেক্সচার। নানা রঙ। নানা আলো মায়ার খেলা। মাঝে দ্বীপের মতো। শিব লিঙ্গ প্রতিষ্ঠিত। মাছকে খাওয়াতে দানা ছুড়ে দিতে হয়। এগিয়ে চলার পথে ছন্দ মিলিয়ে গাইড ভায়া শুনিয়ে দিল কত কথা। বোরিং নয়, শ্যুটিং থেকে শুরু করে একেকটা পাহাড়ের রূপ একেক রকম। ধ্রুব সত্যের মতো বলে দিল বুঝতে পারলে ভালো…না হলে সব শিল্পকলাই মর্ডান আর্ট। নৌকো চলল যতটুকু নদী শান্ত। তারপর নৌকো জলোচ্ছ্বাসের অভিমুখ দেখিয়ে ফিরে এলো বিস্তীর্ণ ঘাটে। রেখে এলাম পাগলির সেই রূপ-অপরূপ ক্ষণ। পাগলি ওখানেই চিরশায়িত। জলটি সবুজ, আসলে জলটি স্বচ্ছ। শ্যাওলার জন্যই প্রতিফলন। আমিও ঝাপ দেবো ঐ নর্মদার সবুজ জলে। একদিন। দেবে আমায় টাকা, একটি ছেলে ত্রিশ টাকার জন্য ঝাপ দিল জলে।

জব্বলপুরের বিশেষ দর্শনীয় স্থান মার্বেল রক দেখার জন্য পাহাড় থেকে নেমে ওই জায়গাটিতেই যেতে হবে। নর্মদা ঘাটে পঞ্চায়েতের তত্ত্বাবধানে নানা ধরনের নৌকার ব্যবস্থা রয়েছে মার্বেল রক দেখার জন্য। নর্মদা নদীর পাড়ে মার্বেল রক প্রকৃতির অনন্য এক সৃষ্টি। আসলে এটা ম্যাগনেসিয়াম বা চুনাপাথরের একটি খাড়া পাহাড়। পাথরের খাঁজে সূর্যের আলো পড়লে সেখান থেকে বিচ্ছুরিত হয় নানা রং। আরও দূরে গেলে একেবারে সাদা। তবে মার্বেল রকের রূপ না কি আরও খোলতাই হয় পূর্ণিমার রাতে। তখন রাতভর পাওয়া যায় নৌকা। যদিও শীতের কুয়াশায় রাত্রিকালীন ভ্রমণ বন্ধ থাকে।

 

 

(৩)

এবার টেম্পো ট্রাভেলার বাসে দীর্ঘ ছয় ঘন্টার যাত্রা। স্মৃতিময় জব্বলপুরের ইতিহাস, মার্বেল রকের মূর্তিদের সম্বল করে পৌঁছালাম নর্মদার উৎসে। অমরকন্টক। রাস্তায় অবশ্য দাঁড়িয়েছিলাম। এখানে ঠান্ডাটা প্রবল। প্রায় ৬ ডিগ্রি মোবাইল দেখালো। নেট সংযোগ ভালই। তবে রাতে রাস্তা বেশ নিস্তব্ধ।

পরের দিন ভোরে ঘুম ভাঙল। অজস্র পাখি। নাম জানা-অজানা। অপূর্ব সে ক্ষণ। জন্ম জন্মান্তরেও ভুলব না। ভোরের এই সময় ভালোলাগার নর্মদা ঘাট সত্যই অনন্য এক শোভা। অনেক পুণ্যার্থী আসছেন। পুজো দিচ্ছেন নদীর অদূরে। কত নিয়ম, কৌশল। তবে নর্মদা অক্ষত। পরিশুদ্ধ। গঙ্গার কথা খুব মনে আসছিল। এখানে স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা আসছে। নর্মদাকে রক্ষা করার এই পরিকল্পনা আমায় নতুন করে বেঁচে ওঠার কথা বলে দিল। জেগে উঠলাম।

সাতপুরা পর্বতমালার কোল দিয়ে ওঠানামা অমরকন্টক অবস্থিত। হিন্দুদের পবিত্র তীর্থস্থান অমরকন্টক। অমরকন্টকে ভারতের দুটি বৃহৎ নদনদীর উৎপত্তি। সাতপুরা আর বিন্ধ্যর মিলনস্থল থেকে নর্মদা যায় পশ্চিমে আর শোন যায় পুবে গঙ্গার সঙ্গে মিশতে। পিচের রাস্তা থেকে মেঠো পথে গাড়ি নিয়ে যাবে ভৃগু কমণ্ডল। পায়ে হেঁটে দেখতে হবে ভৃগু কমণ্ডল। বিশাল বিশাল শাল হরীতকী মহুয়া গাছের ঘন জঙ্গলের মধ্যে পাহাড়ি পথ মাঝদুপুরেও অন্ধকার, ঠাণ্ডা। মিনিট কুড়ির মধ্যে কমণ্ডল দেখা যায়। কল্পনাশক্তির সাহায্য ছাড়া অবশ্য কমণ্ডল বলে বোঝা যাবে না। কমণ্ডলে মন না ভরলেও পথের কথা ভোলা যায় না। যাওয়ার সময়েই দেখেছিলাম জঙ্গলের এক জায়গায় কাটা তার ফেলা আছে। এ বার গাইডকে তাৎপর্য জিগ্যেস করতে জানা গেল, এই তারের এক দিকে ছত্তিশগড় অন্য দিকে মধ্যপ্রদেশ। সেই হিসেবে ভৃগু কমণ্ডল সম্ভবত মধ্যপ্রদেশে পড়েছে। বনের রাস্তা দিয়ে এ বার ত্রিবেণী কুণ্ড। ছায়া ঘেরা কুটিরের পাশে সবুজ পুকুর। এখানে পর্যটকের তেমন দাপট নেই। জঙ্গলের মধ্যে কোনও সাড়াশব্দ নেই। রিসাস মেক্যাক নামে পরিচিত দু’একটা লালমুখো বাদর ছাড়া অন্য কোনও জন্তু চোখে পড়ে না। কিন্তু মধ্যপ্রদেশের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে অবাধে হাঁটার অভিজ্ঞতা মনে থেকে যায়। অভয়ারণ্যে মানুষের হাঁটা নিষিদ্ধ, কাজেই এখানে হাঁটা চলার সুযোগ পেয়ে আমাদের ভারী ফুর্তি।

সন্ধ্যে নামার আগে ফেরার কথা মনে করে আমরা ফের গাড়িতে উঠলাম। এ বার নর্মদা উদগম আর সোনমুড়া। তার আগে গাড়ি থামল মাঠের মাঝখানে প্রাচীন কয়েকটা মন্দিরের সামনে। আমাদের গাইডের কাছ থেকে এই মন্দির সম্পর্কে কিছু জানা গেল না। ভেতরে ঢোকারও উপায় নেই, দরজায় তালা ঝুলছে। এমন সময় চোখে পড়ল পিছন দিকে বড়সড় বটগাছের ছায়ায় ছবির মতো এক মন্দির। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরের পুরোহিত উদয় হলেন।

‘‘মন্দিরের নাম পাতালেশ্বর। একাদশ শতাব্দীর শিবমন্দির, ভেতরে প্রাকৃতিক শিবলিঙ্গ রয়েছে,’’ জানালেন তিনি।

আমার ধারণা ছিল শিবলিঙ্গ মাত্রেই প্রাকৃতিক, কিন্তু সেই মুহূর্তে আর কথা বাড়াতে ইচ্ছে করছিল না। পাতালেশ্বর মন্দিরের পুরোহিতের কাছে জানতে পারলাম, প্রতি বছর শ্রাবণ মাসের কোনও না কোনও সোমবারে মন্দিরের ভেতরের বিগ্রহ জলে ডুবে যায়। ততক্ষণে আমরা সিড়ি দিয়ে নেমে মন্দিরের তলায় শিবলিঙ্গের সামনে দাঁড়িয়েছি। বেশ কয়েক ধাপ সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামতে হয় বিগ্রহ দেখতে। সম্ভবত এই কারণেই মন্দিরের নাম পাতালেশ্বর। শান্ত পরিবেশে প্রাচীন মন্দির দেখার মধ্যে যে অন্য একটা স্বাদ পাওয়া যায় তা পাতালেশ্বরের সামনে দাঁড়িয়ে বিলক্ষণ টের পেলাম। অজানা হলেও পুরনো মন্দিরগুলো তাকিয়ে দেখার মতোই।

এর পর নর্মদার উৎস। চুনকাম করা দেওয়াল ঘেরা প্রাঙ্গণের মধ্যে বেশ কয়েকটা সাদা সাদা মন্দির। মাঝখানে সবুজ রঙের বড়সড় হ্রদ। গাইড বলল, এই হ্রদই নর্মদার উৎস। আমরা অবিশ্বাস ভরে লেকের দিকে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। পাহাড়ের গা থেকে তিরতির করে নর্মদা বেরোচ্ছে, এমন কত স্বপ্নিল চিন্তা নিয়ে উৎস দেখতে এসে শেষে এই হ্রদে পৌছে বড় বিপন্ন বোধ করতে থাকি। মাটির তলা থেকে জল উঠে আসছে। অবাক করা সব কবিতা। তবে নারী মূর্তির এই মাতৃরূপ ভীষণরকম প্রিয়। পাগলিময় বিশ্ব।  আশেপাশে মন্দিরে অনেক দর্শনার্থী, মন্দির দর্শন করে কপালে টিপ নিয়ে প্রসন্নমুখে প্রাঙ্গণে ঘুরে বেড়াচ্ছে। নর্মদার মন্দির প্রাঙ্গন নতুন ও পুরাতনে বিভক্ত। মন্দিরের নতুন অংশে…সাদা চুন দিয়ে রঙ করা। চুনা পাথরগুলো অনেক স্থানেই ভগ্ন। তবু সুন্দর করে সাজানো। নর্মদা মাইয়া। শুধু আমরাই নর্মদার উৎস দেখে অতৃপ্ত আত্মা নিয়ে চললাম পরের লক্ষ্য, শোন নদের উৎসের দিকে।

উৎস কথা বলে দেয় নর্মদা স্পর্শ

প্রকৃতি শুদ্ধতায় মনে জাগে হর্ষ

 

লম্বা এক সারি সিঁড়ি নেমে গিয়েছে। ধাপের শেষে বাঁধানো চত্তর, এক ধারে পাহাড়ের গা থেকে দুটো ফুটো দিয়ে তিরতির করে জল বেরোচ্ছে। সেই ফুটো ঘিরে একটা চৌবাচ্চা, তার মধ্যে এক দেবমূর্তি। বাধানো চত্তরের তলা দিয়ে চলেছে শোন। একটু এগোতেই দেখা গেল লোহার পাইপ দিয়ে হু হু করে জল বেরিয়ে অল্প দূরে জলাশয় মতো তৈরি করেছে। সেই জলাশয় থেকে জল ধীরে ধীরে পাহাড়ের ধারে পৌছে ঝরনা হয়ে পড়ছে কয়েকশো ফুট নীচে। শোন নদ যাত্রা শুরু করছে পুবে গঙ্গার দিকে।

তাই বলে লোহার পাইপের মধ্যে দিয়ে সোননদের উৎপত্তি? কিছুতেই কথাটা মেনে নিতে পারলাম না। বারবার মনে হতে লাগল ভারতীয়দের ধর্মভাবের সঙ্গে সৌন্দর্যবোধের এতটা শত্রুতা কেন। একটা রক্ষা করতে গিয়ে অন্যটাকে কি ধ্বংস না করলেই নয়? নর্মদা বা সোনের মতো নদনদী পরে অসাধারণ চেহারা নেয়। তবু এই দুই বড় নদনদীর উৎপত্তিস্থলকে এমন বিচিত্রভাবেই কি রক্ষা করতে হবে?

ছত্রিশগড়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দেখা যাচ্ছে….অদূরে শ্যোন নদী। শিপ্রা নদী। ভারতবর্ষের হৃদয় সত্যই আরও কয়েক কোটি বছর এভাবেই সবুজ আভায়, পাগলিময় নদীমাতৃকতায় অমর হবেই কারণ এখানে তৈরি হচ্ছে লক্ষ্মী শ্রী যন্ত্রমের আদলে মন্দির। ভারতবর্ষের শ্রী ফেরাতে লক্ষ্মী সরস্বতি তাই সুদিন ফেরাবেই। এই বিশ্বাসও থাকা প্রয়োজন। এরপর দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর কপিল ধারা দেখে, তৈরি হচ্ছে বিশাল জৈন মন্দির দেখে ফিরে এলাম ঘাটে। অমরকন্টকের আরতি দেখে মনে হল কোনও বুজরুকি নেই। এই মানুষগুলি মন থেকে আরতি করে। সত্যই মায়ের সেবক হয়ে উঠছে এই সমস্ত মানুষ। পাগলি বোধহয় এদের মধ্যেই লুকিয়ে। হয়তো নর্মদাকে রক্ষা করার তাগিদ জুগিয়ে চলেছে প্রতিদিন।

আরতি হচ্ছে নর্মদা মাইয়ের

পাগলি মনেও বিস্ময়,

এলোমেলো চুলের এ ভালবাসায়

কবি মন চায় আশ্রয়

 

(৪)

বান্ধবগড়ের পথটি বিশ্রামহীন এক চলতে থাকা। পরের দিন ভোরেই অমরকন্টক থেকে রওনা দিলাম। পেণ্ড্রা রোড থেকে উমরিয়া পৌছতে ঘন্টা চারেক সময় লাগে। ট্রেনের নাম বিলাসপুর-ইন্দোর নর্মদা এক্সেপ্রস। সূর্য ডুবেছে কিছুক্ষণ আগে। গরুরা ঘরে ফিরছে। তাদের পায়ের ধুলো আকাশে বাতাসে ছেয়ে যাচ্ছে। আক্ষরিক অর্থে গোধূলির মধ্যে দিয়ে আমরা চলেছি। দূরে সাতপুরার আভাস দেখা যাচ্ছে, কখনও শাল গাছের সারি এসে তা ঢেকে দিচ্ছে। রয়ে যাচ্ছে গোধূলির গোলাপি আভা। চারিদিকে জনমানুষ নেই। এমন পরিবেশ সাধারণত দেখা যায় না। আমাদের পরিচিত বলয়ের কত বাইরে, কত নতুন, কত বিচিত্র। আমরা যে চলেছি জঙ্গলের কাছে এ সব যেন তারই আয়োজন।

ভারতের যে কয়েকটা রাজ্যে দেখার মতো জঙ্গল এখনও রয়েছে, তাদের মধ্যে অন্যতম মধ্যপ্রদেশ। কানহা বান্ধবগড় পেচ পান্না সঞ্জয় মাধব বোরি রাতাপানি… তালিকা নেহাত ছোট নয়। সব জঙ্গল আমার দেখা হয়নি, তা সত্ত্বেও অনায়াসে বলতে পারি এই সব জঙ্গলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হল কানহা। বান্ধবগড়ের প্রচার অবশ্য কানহার চেয়ে অনেক বেশি। কাজেই বান্ধবগড় সম্পর্কে বিশেষ আগ্রহ ছিল। যেমন আছে পেচ বা শিবপুরী সম্পর্কেও। মাঝে এলাচ দেওয়া চা খেয়ে মনটা খুশিতে ভরপুর। বান্ধবগড়ে সন্ধ্যায় পৌঁছালাম। এখন অরণ্য রাজ। এখন অরণ্য দেবের প্রয়োজন। এখন চাই ফেলে আসা ক্লিশে জীবন থেকে মুক্তি। অরণ্যের বুকে অক্সিজেনে আমার পাপ ধুয়ে যাক। অরণ্যের মধ্যে যে পাগলি সে পাগলি…

অন্ধকারের সুর শিখিয়ে দেয় পথ কথা

ঠান্ডার শিহরণেও থাকুক কিছুটা নীরবতা

তার পরের দিন ভোরে দেখা দিল। সাফারি। প্রচন্ড ঠান্ডা। কোনও কিছুতেই হাতের আঙুলে তেজ নেই। অবশ। তবু অন্ধকার পেরিয়ে আলো। ভোর সাড়ে পাঁচটা থেকে এগারোটা পর্যন্ত এক বন ভ্রমণ। পাহাড়ের উপর ওঠা। বাঘ। বাঘের গর্জন। অ্যালার্মিং কল। বাইসন। নীলকন্ঠ। হরিণ। প্যাঁচা। চিল। মাছরাঙা। অজানা কত সবুজ। অরণ্য। পাগলি এসব আগলে বসে আছে। কত শীতল। বান্ধবগড়ের পাহাড়, দুর্গ…যেন রক্ষা করছে কুনকে হাতি। আগুনের তাপ চাই। না হলে পাগলির উত্তাপ। কিন্তু এই নিস্তব্ধ জঙ্গলে সে সব কে দেবে। একে নেট নেই…ময়ূরের কেকা, বিশাল সারস, সবই কেমন যেন পাগল করে দেয় মন। বাঘের শাবকের চোখ তো বলে দিচ্ছিল…আমাদের বিরক্ত করো না। বাঘিনীর চোখে যে কবিতা ছিল, ঐ জিভ, গোফ…ওগুলো কী পাগলির খোঁজ দিল।

উমরিয়া জেলায় ৩২টি পাহাড়ে ঘেরা জলা জঙ্গল পশু পাখি নিয়ে বান্ধবগড় জাতীয় উদ্যান। শাল, মহুয়া, কেন্দু, সেজ নানা বড়বড় গাছ জঙ্গলে, এ ছাড়া জায়গায় জায়গায় বাশবনও আছে। আছে জলাশয় ময়দান নদী নালা; নানা রকমের জন্তু জানোয়ার পাখি সরীসৃপ পোকামাকড়। একটু কান পাতলে শোনা যায় প্রাণের ঝঙ্কারে জঙ্গল গমগম করছে। তবে যে সাদা বাঘের জন্য বান্ধবগড় বিখ্যাত, সেই সাদা বাঘ থাকলেও তাকে চোখে দেখা যায় না। ১৯৬৮ সালে বান্ধবগড়কে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই সময় এর আয়তন ছিল ১০৫ বর্গ কিলোমিটার। ১৯৭২ সালে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন প্রণয়নের পর বোঝা গেল বান্ধবগড়কে বাড়িয়ে তুলতে হবে। ১৯৮২ সালে খিটৌলি, মাগধী আর কাল্লাওয়াকে বান্ধবগড়ের আওতায় আনা হলে আয়তন বেড়ে দাড়ায় ৪৪৮ বর্গ কিলোমিটারে। ১৯৯৩ সালে বান্ধবগড় আসে ব্যাঘ্র প্রকেল্পর আওতায়। সেই সময় পানপাতা অভয়ারণ্যকে বান্ধবগড়ের অংশ করে নেওয়া হয়। আপাতত বান্ধবগড়ের প্রধান বা কোর এলাকা ৬৯৪ আর পারিপার্শ্বিক বা বাফার এলাকা হল ৪৩৭ বর্গ কিলোমিটার।

অরণ্যের দিন রাত্রিতে অবাক করা সামিয়ানা। ছোট্ট পোস্ট অফিস। আজও মানুষের চিঠি আদান প্রদান, পশুপালনে মহিলাদের অংশগ্রহণ আমায় বলে দিল, পলাশের বসন্তে এসো। দেখবে আমার রূপ। সত্যই পাগলিকে খুঁজতে এই অরণ্যকথায় আমায় ফিরতে হবেই। না হলে যে কবিতারা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

তোমরা আমায় বাঘ দিতে পারো

যে আমার রক্তকে চেটে বলবে

‘’হে অপদার্থ লহ প্রণাম’’

 

(৫)

ভ্রমণের দশমীর শঙ্খ বেজে ওঠে। খাজুরাহোর পথে প্রায় পাঁচ ঘন্টার যাত্রা চালু থাকে। খাজুরাহো নতুনরকম। কারণ ইউনিসেফ হেরিটেজ। গরীব অঞ্চল। বুন্দেলখন্ড। পর্যটন অর্থনীতি। তবু আসবার সময় কিছু রাস্তার অবস্থা প্রচন্ড খারাপ। তবু খাজুরাহোর বিমান বন্দর ভুলিয়ে দিল অনেক কিছু। সন্ধ্যা নামা শহরের দোকানরা বাম্বু ফাইবারের কটন ও সিল্কের শাড়ির জন্য অপেক্ষারত। নারীরা সে সব ব্যাগে নেবেনই। আমার পাগলি হয়তো ঐ শাড়ির দোকানেই অপেক্ষারত।

পরের দিন সকাল। খাজুরাহোতে অনেক মন্দির। তার অনেক ইতিহাস। আমি সেই ইতিহাস কথায় ভ্রমণসঙ্গী হলাম। গাইড বুঝিয়ে দিল। ত্রিশ টাকার টিকিট। তবে ভিতরে প্রায় বারোটি বড় মন্দির। এটি ছিল পশ্চিমঘাট। বিকেলে দেখলাম পূর্ব ঘাট ও দক্ষিণের একটি মন্দির। পশ্চিমঘাটে এরোটিক (যৌন-কামনা উদ্রেককারী) মূর্তি প্রচুর। কারণ সেই সময় রাজারা চাইতেন সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখতে এই মন্দির অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কালক্রমে মন্দিরের অনেকগুলো ধ্বংস হয়েছে। যে গুলো রয়েছে, তাই হেঁটে দেখে শেষ করা যায় না। কত ইতিহাস। মনে হয় পাগলি রাগ করে এই মন্দিরগুলোর প্রতিটি খাঁচে লুকিয়ে। আমি শুধু সে সব দেখেই চলেছি। তবে এই সকল মন্দিরে শিব, বিষ্ণু ভাঙা থাকায় তা পুজো হয় না। পুজো হয় এই পশ্চিমের মন্দিরের বাউন্ডারির বাইরের দিকে একটি মন্দিরে। আমি সেই মন্দিরে শিব লিঙ্গের উচ্চতা ও ব্যাস থেকে অবাক। কত সৃষ্টি তো এই ভারতবর্ষেই রয়েছে। আমি তার কিছুই তেমন দেখে উঠতে পারিনি। দেখছি।

অপরদিকে পূর্ব দিকের মন্দিরগুলি জৈন মন্দির। মহাবীর, পার্শ্বনাথ ওঁনাদের উলঙ্গ দেহ। তবে এরোটিক মূর্তি নেই। রাম সীতা, নারায়ণ পার্বতী মূর্তি বিশেষ ভাবে দেখা যায়। এখানেও নাগকন্যা আছে। এখানেও দাড়ি দেখে ব্রহ্মা, যমরাজ, ইন্দ্রকে বুঝতে হবে। দাড়ির নটগুলো আলাদা।

শিল্পকর্ম নয় শরীর পাগলিময়

খাজুরাহো মিশছে কবি’র আত্মায়….

সবশেষে বিস্ময়। অপদার্থও বিস্মিত হয়। মূর্তি। কারুকার্য। একদিকে সন্ধ্যা নামছে। অন্যদিকে মন্দিরের ভিতর মূর্তিতে মাথাটি লিঙ্গের মতো, মাঝে মুখটি বুদ্ধদেবের আদল, শরীরের গঠন বিষ্ণুর মতো, আর নিচে পদ্মের অবস্থান ব্রহ্মার মতো। অপূর্ব। বাইরে দেখলাম এক বিদেশিনী আরও অন্য দুই বিদেশিনীকে কি সব বোঝাচ্ছে। কে জানে আমার পাগলি তার মধ্যে মিশে গেছে কিনা। সন্ধার খাজুরাহোর পশ্চিমঘাটের মন্দিরে আবার গিয়েছিলাম। লাইট অ্যান্ড সাউন্ড। ইতিহাস ও আলো মিশে গেছে এখানে। অপূর্ব এক চেতনা।

খাজুরাহো অভ্যন্তরীণ প্রেমমূলক ভাস্কর্যের মধ্যযুগীয় হিন্দু ও জৈন মন্দিরগুলি এক বৃহত্তম সমষ্টি, মধ্য ভারতের চান্ডেলা রাজবংশের সময় নির্মিত হয়েছিল। এই রাজবংশের পতনের পর, মন্দিরগুলি পরিত্যক্ত ও বিস্মৃত হয়ে পড়ে এবং মূল ৮৫ টি মন্দিরের মধ্যে কেবল ২২-টি মন্দির টিকেছিল। এই ৮৫ টি মন্দির তৈরি করতে লেগেছিল ১০০ বছর। ৯৫০ সাল থেকে ১০৫০ সাল অবধি এ মন্দির ও শিল্পকর্মগুলো করা হয়। এই চান্দেলা বংশের সৃষ্টি নিয়ে ইতিহাস অনুসারে রাজপুতদের সাথে অন্য বংশের মিলনের ফলে এই বংশের সৃষ্টি। এবং এই বংশের প্রথম সদস্যের নাম ছিল চন্দ্রত্রেয়। যিনি ছিলেন বীর। খাজুরাহো থেকে ১৯ কিলোমিটার দক্ষিনে মানিয়াগড়ে ওরা বাস করত। তাদের কূল দেবতা ছিলেন মানিয়াদেব। চন্দ্রত্রেয় নাম থেকেই চান্দেলা। যাদের প্রতাপ ১৪০০ সাল অবধি ছড়িয়ে ছিল। চন্দ্রত্রেয় বা চন্দ্রবর্মন ছিলেন একজন সেনাপতি। পূর্বের দিকের সাথে যুদ্ধ বিগ্রহ লেগেই থাকত। দখল বেদখল হত। তার সমসাময়িক হর্যবর্ধন, যশোবর্ধনের নাম জানা যায়। প্রতিহার বংশের হয়ে তারা প্রথমে রাষ্ট্রকূট পরে পূর্ব ভারতের পালেদের হাত থেকে কলিঞ্জরের দূর্গ পূনদখল করেন। কিন্তু দূর্গটি প্রতিহারদের কাছে না দিয়ে নিজেরাই দখল করে বসেন। সেই থেকেই এই বংশের শাসক হিসেবে উত্থান হয়।

শিলালিপিতে পাওয়া যায় দশম শতকের রাজা ছিলেন হর্ষদেব, তারপর যশোবর্ধন, ধঙ্গ, গন্ড, বিদ্যাধর। যশোবর্ধনের ছেলের লেখা ৯৫৪ সালের একটি শিলালিপিতে পাওয়া যায়। যশোবর্ধন একটি অসামান্য বিষ্ণু মন্দির তৈরি করেছিলেন। গন্ড (১০০২-১০১৭), বিদ্যাধর (১০১৭-১০২৯) রাজ্য শাসন করেন।

বিদ্যাধরের সময় চান্দেলারা গজনির সুলতান মাহমুদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত এবং জয়ী হন। ১০১৯ ও ১০২২ সালে মাহমুদের সাথে তারা যুদ্ধ করেন। এ যুদ্ধে পরিবাজ্রক আল বেরুনি মাহমুদের পক্ষে অংশগ্রহণ করেন। আল বেরুনিকে নিয়ে বলতে হলে বলতে হবে, তখনকার দিনে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনবান জায়গা ছিল ভারত উপমহাদেশ। পৃথিবী থেকে তখন দরবেশের বেশে, ব্যবসায়ীর বেশে এখানে এসে ইসলামের ভিত্তি মজবুতের বিষয় ও ভিতরের খবর নিয়ে যেত। আল বেরুনি ও তেমন একজন। পুরো ভারত ভ্রমণ করেন। এবং এখানকার সব খবর মধ্য পৃথিবীর বাদশাদের কাছে পৌঁছে দিতেন। ১৩৩৫ সালে ইবনে বতুতা এ এলাকা ভ্রমণ করেন। তেরো শতকের এ রাজ্যের গুরুত্ব কমতে থাকে। ১৪০০ শতকে এসে হারিয়ে যায়। সবকিছু জঙ্গল হয়ে যায়। মানুষ ও ভুলে যায় এ এলাকার কথা। কিন্তু মন্দিরগুলো পড়ে থাকে। ধ্বংস হতে থাকে আপন নিয়ম মেনেই।

ব্রিটিশদের চোখে পড়ার পর এ এলাকা আবার জেগে উঠতে শুরু করে। ১৮১৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারী কলিকাতার এশিয়াটিক সোসাইটিতে লেফট্যান্ট উইলিয়াম প্রাইস নামের এক গবেষক একটি গবেষণা পত্র জমা দেন। তাতে এ এলাকার কথা বলেন। সেই সুত্র ধরে ১৮১৮ সালের ফ্রাঙ্কলিন নামের এক মানচিত্রকারের মানচিত্রে খাজোরাহো নাম ঢুকে পড়ল। ১৮৩৮ সালের ক্যাপটেন টি এস বাট জঙ্গলে আবৃত এ মন্দিরগুলো পরিদর্শন করেন। ফিরে এসে যে রিপোর্ট করেন তাতেই সবার দৃষ্টি পড়ে খাজুরোহোর দিকে। এরপর বৃটিশরা স্হাপনাগুলো রক্ষার্থে কাজ করে।

মন্দিরে এ সমগ্র চিত্র কর্ম কোন শিল্পী তৈরি করেছিলেন তা অজানাই রয়ে গেছে। কেন তৈরি করিয়েছিলেন চান্দেলারা-এ শিল্পকর্মগুলো? সে নিয়ে বিস্তর গবেষনা হয়েছে। সবচেয়ে শুদ্ধ মতবাদ হল, হিন্দুধর্মে কখন ও যৌনতাকে বেশ শিল্প রুপ দেওয়া হয়েছে। আবার বেশির ভাগ ঋষি-সাধকরা মিলনে পাপ দেখেছেন। মিলন করলে ঈশ্বর সাধনায় বিঘ্ন হবে তাই ছিল তাদের দর্শন। মানব-মানবী যুগলের এ শিল্পকে মোটেই স্হান দেননি। তাদের কথায় মিলনের জন্য ঈশ্বর ধ্যানে চ্যুতি ঘটে। কামকে কঠোরভাবে বারণ করছেন। মিলনকে তারা নেগেটিভই বলেছেন। এখন ও হিন্দু ধর্মের সন্ন্যাসীদের জন্য মিলন বারণ। তেমন একটি অবস্হা সৃষ্টি হয়েছিল মন্দিরগুলো নির্মাণের আগে। যৌনতাকে ঘৃণা করত সবাই। এটি বিশ্রী পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। রাজ্যের লোকেরা যাতে যৌনতাকে ঘৃণা না করে সেজন্য চান্দেলারা মন্দিরের গায়ে শিল্পের মাধ্যমে যৌন মিলনে উৎসাহিত করার একটি সংবাদ পৌঁছে দিয়েছিলেন রাজ্যবাসীকে।

মন্দিরগুলি পশ্চিমী, পূর্বীয় ও দাক্ষিণ্য বিভাগে বিভক্ত ছিল। মন্দিরের অভ্যন্তরে জীবন শৈলী যেমন – যুদ্ধবিগ্রহ, বিবাহ, আধ্যাত্মিক প্রতীক, দৈনন্দিন জীবন ও জীবন ধারণের সমস্ত গঠনের থেকে বিস্তারিত কীর্তিকলাপের বর্ণিত দৃশ্যের ভাস্কর্য খোদাই করা রয়েছে। বিভিন্ন মন্দিরগুলি ভিন্ন ভিন্ন দেবদেবী যেমন – শিব, সূর্য এবং ভগবান বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত। একটি অনন্য শৈল্পিক সৃষ্টির প্রতিনিধিত্বকারী, লক্ষণ মন্দিরে ভগবান বিষ্ণু ও তাঁর অবতার প্রভু নরসিংহ, প্রভু বরাহ ও ভগবান বামনের ভাস্কর্য্যের বৈশিষ্ট্যগুলিও উপস্থিত রয়েছে। প্রভু ব্রহ্মা ও প্রভু বিষ্ণুর মাঝখানে দেবী লক্ষ্মীর মূর্তিটি দণ্ডায়মান। এখানে দৈত্য মহিষাসুরকে হত্যাকারিনী দেবী দুর্গার মূর্তিও রয়েছে। পূর্বীয় মন্দিরের সমষ্টিগুলি ব্রহ্মা মন্দির, বামন ও জাভারি মন্দির, পার্শ্বনাথ মন্দির, ঘন্টাই মন্দির, আদিনাথ মন্দির ও শান্তিনাথ মন্দিরের সমন্বয়ে গঠিত। দাক্ষিণ্য সমষ্টির মধ্যে কেবল দুটি মন্দির অন্তর্ভূক্ত রয়েছে – ধূলাদেও মন্দির ও প্রখ্যাত চর্তুভূজ মন্দির। কান্ডারীয় মহাদেব মন্দির হল এমন একটি মন্দির; যেটি বিশ্বজুড়ে প্রসিদ্ধ। এটিতে ৩০.৫ মিটার আকৃতির আস্ফালিত খাজুরাহোর সর্বোচ্চ কুন্ডলী রয়েছে।

খাজুরাহোর মন্দিরগুলি, তাদের প্রেমমূলক কামদ শিল্পকর্মের জন্য বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। মন্দিরের অভ্যন্তরীণ ও বর্হিভাগ, উভয় দেওয়ালগুলিতেই পরীদের সুসজ্জিত ও যৌন ক্রিয়ায় লিপ্ত ভাস্কর্য্য দেখা যায়। খাজুরাহো, ভারতের মধ্যপ্রদেশের একটি ছোট গ্রাম। কিন্তু গ্রামটি সারা বিশ্বে বিখ্যাত কিছু মূর্তির জন্য। এ গ্রামের মন্দিরের গায়ে ইরোটিক মূর্তি বা শিল্পকর্ম আছে। মূর্তিগুলোও প্রায় ১০০০ বছরের পুরনো। ওয়াল্ড হেরিটেজ ও ভারতের সাতটি আশ্চর্য দর্শনের মধ্যে এটি একটি…

পরের দিন সকালে খুব খারাপ রাস্তা পেরিয়ে, গ্রামের মধ্যে দিয়ে গম চাষ দেখতে দেখতে এলাম মাহোবা স্টেশন। তারপর ট্রেনে। ছয় ঘন্টা লেট। এসে পৌঁছালাম হাওড়া স্টেশন। ব্রিজের উপর দিয়ে পাগলি হেঁটে চলেছে। আর আমি চলেছি সেই কবিতা লিখব বলে। সত্যিই আমি অপদার্থ।

সোমাদ্রি সাহা :29/05/2017

(অপদার্থের আদ্যক্ষর নারী সংখ্যায় প্রকাশিত)

 

Facebook Comments

শেয়ার করুন সকলের সাথে...