খবর ২৪ ঘন্টা

আজ সোমবার ~ জেনে নিন দেবাদিদেব মহাদেবের পৌরাণিক মাহাত্ম্য …

শেয়ার করুন সকলের সাথে...

আজ সোমবার, তাই দুধ, বেলপাতা সহ মহাদেবের পূজা করতে সকলে উপস্থিত হবে মন্দিরে মন্দিরে, এটাই জানা। কিন্তু ইতিহাসে মাহাত্ম্যকথা! সে তো পুরাণ বলে, তবে কি একবার মন খুলে আজ কিছু মাহাত্ম্য জেনে নেওয়া যায় না? নিশ্চয়, আসুন জেনে নেওয়া যাক নাগেশ, রামেশ্বর ও ঘুশ্মেশ্বর শিব মাহাত্ম্য।

** রাবণ কে হিতসাধনের অঙ্গ করে নাগেশ মাহাত্ম্য গড়ে উঠেছে। রাবণ একবার নারদের চাতুরীতে পথের স্খলন করেন। নারদ মহাদেদের উদ্দেশ্যে উন্মাদ” শব্দ ব্যবহার করে কৈলাস পর্বত উত্তোলন করতে যত্ন নিতে বলেন। কিন্তু শাস্ত্র বলে অল্প জ্ঞানী মানুষ বড়ই বিপদের কারণ হয়। আর অন্যকে বিনা বিচারের শাশ্বত বলে গ্রহণ করে ফেলে, ফল মারাত্মক। অনুরূপে রাবণ বলের দ্বারা কৈলাস তুলে ফেলে পূর্বে স্থিত করে, আর ফলস্বরূপ মহাদেব রাবণকে অভিসম্পাত করেন। আর এমনই চাতুরী তেই নাগ্বশ জ্যোতিঃ সৃষ্টি। এখন প্রশ্ন তবে নাগেশ কে? পুরাণ বলে দারুকানাম্নী পার্বতীর বলে বলদর্পিতা রাক্ষসী হয়ে ওঠেন। আর তাঁর স্বামী দারুক অতিশয় বলশালী ছিলেন। আর দুষ্ট যে ধর্মের পথের বিরোধী হবে সে তো বলার অপেক্ষাই রাখে না। আর এদের সেই সুখী থাকার উপাদান তা তো পুরাণ পড়লেই বোঝা যায়। পশ্চিমে সাগরে কাছে তাঁর এক বন ছিল, যা পার্বতীর বলে দারুকে সাথে সাথে চলত। আর এই তাণ্ডব থেকে রক্ষা করতে মানিশরণ্য ঔর্ব্ব ঋষিদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। আর সিদ্ধান্ত নিয়েই সেই রাক্ষসদের অভিসম্পাত দিয়েছিল। আর শাপে রাক্ষস রা নিজেদের প্রতাপ হারায়, সাথে সাথে দেবতারা শক্তি দিয়ে যুদ্ধে নামেন। কিন্তু এই সঙ্কটে তাদের বাঁচালেন রাক্ষসী। কারণ পার্বতীর কাছে আশীর্বাদ প্রাপ্ত। রাক্ষসী রাণীর জয়জয়কার হলো, এবার রাণী জলে বন নিয়ে রাক্ষসদের সাহায্য করল। আর দিনের পর দিন জলপথে মানুষ ধরত। তবে ভুল বশত তারা একদিন এক পরম শিব ভক্ত বৈশ্য কে ধরে। সে কোনদিন শিবের মাথায় জল না ঢেলে খেতো না। তবে তার স্বচেষ্টায় কারাগারের সকলে শিবের ধ্যান করতে থাকে। রাক্ষসরা পরে জানতে পেরে তাঁকে মারতে উদ্যত হলে তারা শঙ্কর! রক্ষা কর ; রক্ষা কর ; হে দেবসত্তম বললেই সেই স্থলে ভূমিকে ছেদ করে শিব আবির্ভূত হন আর রাক্ষসদের হত্যা করেন। আর বাদ সাধে রাক্ষসী। সে পার্বতীর ধ্যান করে মাকে তাঁর পরিবার রক্ষা করতে বলেন। পার্বতী আর শিবের কোন্দল শুরু হয়, তবে পার্বতী শিব কে আশ্বস্ত করেন যে, শেষে মহাদেব সফল হবেন। রাক্ষসী পার্বতীর কৃপায় বংশ রক্ষা করে আর মহাদেব বলেন কলিযুগের সমাপ্তিতে মাহাসেন পুত্র বীরসেন তাঁকে দর্শন করে চক্রবর্তী হবে। আর সেইখানেই শিবের নাম নাগেশ। আর শোনা যার এই নাগেশ্বরের পূজা করেই নাকি পাশুপাত অস্ত্র লাভ হয়,যা দুষ্ট দমনে সহায়ক। আর যিনি এই নাগেশ্বর জ্যোতিঃ লিঙ্গ পূজা করেন, তাঁকে মহাপাতক হতে হয় না। এখানে নাগেশ্বরের মাহাত্ম্য বিদ্যমান।

**এবার আসি রামেশ্বর মাহাত্ম্যকথায়। একবার শ্রীরামচন্দ্র, লক্ষ্মণ ও সুগ্রীব অষ্টাদশ পদ্ম সংখ্যায় বানরদের নিয়ে সমুদ্রের তীরে উপস্থিত হলেন। আর তখন রামচন্দ্র জনক নন্দিনীর চিন্তায় মত্ত হয়েছেন। এমতাবস্থায় রামচন্দ্রের জল পিপাসা পেলো।তিনি জলপান করতে যাবেন এমন সময় মনে হলো শিবদর্শন না করে জল কি করে পান করবেন। আর কথা মাত্র কাজ, পার্থিব শিবলিঙ্গ তৈরি করেন। উপাচারে নিজের মতো করে সাজিয়া তাঁর পূজা করতে শুরু করলেন। মহাদেব তাঁর আহ্বানে সাড়া দেন, এবং নিজে রামচন্দ্র কে আশীর্বাদ করেন। রামচন্দ্রের অনুরোধে লিঙ্গরূপী মহীতলে রামেশ্বর নামে প্রসিদ্ধ হয়ে সমুদ্রতীরে অবস্থান করছেন। তাঁর কথা শোনা মাত্র সব পাপ দূরীভূত হয়, তিনি পাপ নাশক এবং মঙ্গলময় স্বরূপ।

**দক্ষিণদিকে দেব নামে এক পর্বত বর্তমান। সেখানে অদূরে ভরদ্বাজ বংশসম্ভূত রাজা সুধর্ম্মা বাস করতেন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন ধর্মপরাযণ।কিন্তু তাঁদের সন্তান ছিল না, তাই দু:খে স্ত্রী প্রাণ বিসর্জন দিতে চেয়েছিলেন। ব্রাহ্মণ পণ্ডিত, তিনি অনিত্য ভাবনাকে বিসর্জন দিতে বললেন। আর স্ত্রীকে বকাবকি করলেন। এমন একজন স্ত্রীকে বকাবকি করলেও তিনি দু:খ পেলেন। শত চেষ্টা সত্ত্বেও শিবের কাছে বিবিধ উপাচারে সন্তান আর তার লাভ হলো না। ব্রাহ্মণ শিব ও অগ্নি সাক্ষী করে একটি পুষ্প গ্রহণ করলেন, যেখানে সুধর্মার পত্নী আবারো ভুল করলেন। ব্রহ্মণ ভেদ ভাব ছেড়ে পত্নীকে জানিয়ে দিলেন যে, সে মা হতে পারবে না। পত্নী কিন্তু নাছোড়বন্ধ হয়ে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রী ঘুশ্মার সাথে স্বামীর বিবাহ দিলেন আর নিজে দাসী হয়ে গেলেন। স্বামীর। কথা মেনে ঘুশ্মা রোজ একাত্তরশত পার্থিব শিবলিঙ্গ তৈরি করত আর বিসর্জন দিতো। প্রতিদিন এমন রোজ করতে করতে তাঁদের ঘরে এক সুন্দর পুত্রের জন্ম হলো । আর আত্মীয় স্বজনদের প্রশংসা, মানুষের আহ্লাদ, স্বামীর সুখী ভোগে প্রথম স্ত্রী হিংসা করলেন। তিনি ঘুশ্মার সন্তাকে একদিন ছুরির দ্বারায় আহত করলেন। আর যেই খানে ঘুশ্মা পার্থিব শিবলিঙ্গ ভাসাত সেইস্থানে ভাসিয়ে দিলেন। এরপর ঘুশ্মা কাঁদতে কাঁদতে শিবের সেই লিঙ্গ পূজা করলে শিব আবির্ভূত হলেন। শিবের আশীর্বাদে ঘুশ্মা পুত্র ফিরে পেলেন কিন্তু ক্রোধে আগুন হয়ে সুদেহাকে বিনাশ করতে চাইলেন। সুদেহার জন্য ঘুশ্মা মহাদেবকে পূজা করেন এবং অনুনাদ বিনয় করতে থাকে। মহাদেব তাই সন্তুষ্ট হয়ে ঘুশ্মা নাম নিয়েই পূজিত হন এবং আশীর্বাদ করেন যে, তাঁর বংশে কখনই সন্ততিবিচ্ছেদ হবে না। সেই থেকেই এই ঘুশ্মা জ্যোতিঃ লিঙ্গের মাহাত্ম্য ছড়িয়ে পড়ে। এই লিঙ্গেয় পূজা সুখ আসে, সন্তান আসে এবং সকল পাপ হতে মুক্ত হওয়া সম্ভব হয়। এমনকি কিছুক্ষণ শুনলেও কোন ব্যক্তি পাপ হতে মুক্ত হতে পারেন – তবে সেটা বিশ্বাস, ভক্তির পরিচায়ক।

আজ প্রমাণিত যে, ভালো কর্মের সাথে মন আর আয়োজন অপেক্ষা ধ্যান বিশেষ প্রয়োজন। এই ভাবে যুগে যুগে বিবিধ ভাবে মাহাত্ম্য মানুষকে মুক্তির পথে নিবেদন করেছে নিরন্তর – এখানেই জীবনের সার্থকতা।

Facebook Comments

শেয়ার করুন সকলের সাথে...