খবর ২৪ ঘন্টা

যোগাদ্যা মায়ের বন্দনায় রাঢ়ের বর্ধমান…

শেয়ার করুন সকলের সাথে...

ওয়েব ডেস্ক,নিজস্ব প্রতিনিধিঃ   বর্ধমান – কাটোয়ার কৈচর বা স্থানীয় রেলস্টেশন নেমেই যেতে হবে প্রায় ৫ কিলোমিটার। যুগ যুগ ধরে যোগাদ্যা মায়ের  কাহিনীতে ভরসা রেখেই ভক্তের আনাগোনা। সাধারণ ভাবে মায়ের আলোচনা করতে গিয়ে “যোগাদ্যা ” সম্পর্কে “অ্যানশিয়েন্ট ব্যালাডস অ্যান্ড লিজেন্ডস অব হিন্দুস্থান “ নামক গ্রন্থ থেকে পাওয়া যায়…

” The bracelets were enamelled – So
The price is high, How? Sold it to mine!
who bought them, I should like to know ”
” Thy daughter – with the large black eye,
Now bathing at the marble ghat….. 

এখন প্রশ্ন, হঠাৎ ইংরাজি কেন? আসলে এই কাহিনি নিয়ে গোবিন্দচন্দ্র মেয়ের রাঢ়ের বিদুষী তরু দত্তহারী এই লেখাটি লিখেছিলেন। তাঁর বাবা তাঁকে ইউরোপে নিয়ে গিয়ে শিক্ষিত করে তোলেন। কিন্তু তিনি এতো সব জানলেন কি করে? আসলে তাঁর জ্ঞাতিভাই রমেশ্চন্দ্র দত্ত এই গ্রামে এসেছিলেন। আর তাঁর লেখাই সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত অনুবাদ করেন।

এখন বলি এই জল থেকে তোলার গল্প। প্রতি বছর ৩১ বৈশাখ বা বৈশাখী সংক্রান্তির দিন দেবীকে জল থেকে তুলে পূজা করা হয়। তারপর লক্ষ লক্ষ ভক্তের দর্শনের পর ফের ক্ষীর পুকুরে জলের নীচে ফিরে যান দেবী। কিন্তু এখানে বলি হয়। অতীতে নাকি এখানে নরবলিও হতো আজও দেবীকে বৈশাখী সংক্রান্তিতে ভোরে জল থেকে তোলার সময় ডোমসম্প্রদায়ের কাউকে বুক চুরে রক্ত বের করে বলতে হয়, “নে মা! নররক্ত খা। ”

 

বছরে মাত্র পাঁচ দিন অক্ষয় নবমী, বিজয়া দশমী, ১৫ পৌষ, মাকুরি সপ্তমী ও বৈশাখী সংক্রান্তির দুদিন আগে দেবীকে জল থেকে তোলা হয়। কিন্তু বলিদান, উপাচার সবই মানলাম তবে, দেবীর এই জলে থাকার ব্যাপারটা কি? কেনই বা জলে? দেবী নাকি দুবার চুরি গিয়েছিলেন। শেষবার মূর্তি চুরি যায় ১৪১১ বঙ্গাব্দে ১৩ ই বৈশাখ।

***প্রতি বছর ৩১ বৈশাখ বা বৈশাখী সংক্রান্তির দিন দেবীকে জল থেকে তুলে পূজা করা হয়। দেখুন সেই ভিডিও…

তারপর ক্ষীরদিঘির জলের ভিতর থেকে শ্বেতপাথরের মন্দির বানিয়ে দেবীকে রাখা হয়। কিন্তু অলৌকিক হলো দেবী নাকি দুবার নিজে থেকেই ফিরে এসেছিলেন। কিন্তু অনেকেই বলেন বিধর্মী দের হাত থেকে বাঁচাতেই নাকি মাকে জলের তলার রাখার ব্যবস্থা।

এবার আসি ইতিহাসের কথায়। ইতিহাস বলে ফুলিয়ার কবি কৃত্তিবাসের রামায়ণে যে লঙ্কাকাণ্ড আছে, সেখানে মহীরাবন ও অহীরাবন বধের পর পাতালে আশ্রিত দেবী আক্ষেপ করে হনুমানকে বলেন, ” সাধিয়া রামের কার্য চলিলা সত্বর/ কে করিবে সেবা মোর পাতাল ভিতর। ” পরে রামচন্দ্রের আজ্ঞায় লক্ষণ কে দুইকাঁধে আর দেবীকে মাথায় নিয়ে হনুমান রওনা হলো –“তবে বীর হনুমান দেবীরে লইয়া / ক্ষীরগ্রামে রাখে তার স্থাপন করিয়া। “। বাংলা সাহিত্যে ভারতচন্দ্র রায়গুণাকার অন্নদামঙ্গলে বলেছেন,” ক্ষীরগ্রামে ডানপরি অঙ্গুষ্ঠ বৈভব / যুগাদ্যা দেবতা ক্ষীরখণ্ডক ভৈরব।। “এটা ভুললে চলবে না ৫১ সতীপীঠের অন্যতম। এখানে দেবীর সতীর ডান পায়ের বুড়ো আঙ্গুল পড়েছিল, তবে এটা ভক্তদের বিশ্বাস।


কাহিনিতে আছে যে, ক্ষীরগ্রামে এক শাঁখারী শাঁখা বিক্রি করতে আসে। সেখানে এক বিশাল দীঘির ঘাটে এক লাবণ্যময়ী বালিকাকে স্নান করতে দেখে। সে শাঁখারীকে শাঁখা পরিয়ে দিতে বলে। দাম দেবার সময় বলে ” আমার বাবা গ্রামের মন্দিরের পুরোহিত। তাঁকে গিয়ে বলো ঘরের কুলুঙ্গিতে পাঁচ টাকা রাখা আছে। সেই টাকা যেন তোমার শাঁখার দামে দেন।

শাঁখারী মেয়েটির কথা অনুসারে পুরোহিতের কাছে গেলে, পুরোহিত বলে তার কোন মেয়ে নেই।এদিকে প্রনাণ স্বরূপ কাউকে দেখতে না পেয়ে পুকুর ঘাটে ব্রাহ্মণ মাকে অনুরোধ করে। মা জলের ভিতর থেকে তাঁর দুহাতের শাঁখা দেখেন। শাঁখারী বুঝতে পারে এ আর কেউ নয় স্বয়ং দেবী।

এইভাবে দেবী নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। আর দেবীর মহিমা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে । তবে আর দেরী কিসের? কলকাতা বর্ধমান লোকাল ট্রেনে করে বর্ধমান, তারপর বর্ধমান কাটোয়া রোড ধরে কৈচর আর তা থেকে পাঁচ কিলোমিটার। মাকে প্রণাম জানিয়ে আজকের মঙ্গবার রাঢ়ের মা যোগদ্যার নামে – সকলের মঙ্গল কামনায় ” প্রণাম মা “।

Facebook Comments

শেয়ার করুন সকলের সাথে...