বাঙালির কিছু নিজস্ব দ্রব্য যা চিরন্তন বাঙালিয়ানার পরিচয়…

IPL লাইভ স্কোর~

শেয়ার করুন সকলের সাথে...
  • 1.8K
    Shares

আপনি ইচ্ছা করলে বাঙালিকে পশ্চিম বাংলার বাইরে, ভারতবর্ষের বাইরে, পৃথিবীর যেকোনো দেশে অতি অবশ্যই ভ্রমন করতে দেখতে পারেন। কিন্তু একজন বাঙালিকে তার ষোলআনা খাঁটি বাঙালিত্ব অথবা বাঙালিয়ানা থেকে বের করতে পারবেন না। পৃথিবীর যেকোন প্রান্তে, যেকোনো জায়গায়, বাঙালি তার নিজের অস্তিত্ব এবং নিজের বাঙালিয়ানার মোড়কে মুড়ে থাকতে পছন্দ করে এবং তাকে দেখে অতি অবশ্যই আপনি বাঙালি বলে চিহ্নিত করতে পারবেন। উত্তর থেকে দক্ষিণে, বোস্টন থেকে বাঁকুড়া, পৃথিবীর যেকোন প্রান্তে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, সত্যজিৎ রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর অথবা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পরিচয়কে সাবেক বাঙালিয়ানার মোড়কে মুড়ে রেখেই বাঙালির বিশ্বজয়এবং বিশ্ববন্দনা।

Related image

মাফলার/ মাঙ্কি ক্যাপ–

বাগা বিচে অথবা সমুদ্রের শীতল আবহাওয়ায় আপনি যদি কোন ব্যক্তিকে মাফলার অথবা মাংকি ক্যাপ পরিহিত অবস্থায় দেখতে পান, তাহলে সেই ব্যক্তিটি অতি অবশ্যই একটি বাঙালি নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে। লাদাখ গেলে যদি সেখানে কোনো বাঙালির দেখা পাওয়া যায় তাহলে অতি অবশ্যই তাকে মাফলার এবং মাংকি ক্যাপ পরিহিত অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়। শুধুমাত্র তাই নয় হয়তবা একটির ওপর আরেকটি করেও মাংকি ক্যাপ এবং মাফলার দেখা যেতে পারে অর্থাৎ একজোড়া মাংকি ক্যাপ অথবা মাফলার পরিহিত বাঙালি লাদাখে যদি ঘুরে বেড়ান তাহলে সেটা অবাক হবার বিষয় নয় ।এর কারণ হল বাঙালি মাত্রই ভীষণভাবে ঠান্ডা লাগার ভয় পায় এবং পৃথিবীর যেকোন প্রান্তের যে কোন জায়গায় সবসময় বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস ও জার্ম ঘুরে বেড়াচ্ছে এরকম ধারণা তাদের মনে বদ্ধমূল। সকালে মর্নিং ওয়াক করতে গেলে, শীতকালে অথবা গ্রীষ্মের গরমে গুলমার্গে বেড়াতে গেলে মাথায় ছাতা, সাথে মাঙ্কি ক্যাপ এবং মাফলার তাদের কাছে এক প্রকার বর্ম স্বরূপ। শুধুমাত্র তাই নয়, অফিসের এয়ারকন্ডিশনে থাকা অবস্থাতেও মাফলার এবং মাংকি ক্যাপ বাঙালির চিরাচরিত সঙ্গী হিসাবে তার সাথে থাকে।

Image result for boroline of bangalee

বোরোলিন–

এরকম বাঙালি সত্যি বিরল যার ক্যাবিনেটে ওষুধ পত্র রাখার জায়গায় বোরোলিন পাওয়া যাবেনা। “সুরভিত অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম” বোরোলিন আর বাঙালি– দুইয়ের সাবেকিয়ানা মিলেমিশে এক হয়ে রয়েছে। ভালোলাগা ও ভালোবাসার অনবদ্য মেলবন্ধন এবং সামান্য কাটাছেঁড়া থেকে শুরু করে শীতকালে শুষ্ক ত্বকের পরিচর্যা, যে কোনো ক্ষেত্রেই বাঙালির কাছে বোরোলিন অনবদ্য। চিরাচরিত সবুজ রঙের খাপে করা এই বোরোলিন ছাড়া বাঙালির ওষুধের বাক্স অসম্পূর্ণ। ভারতবর্ষের সমগ্র জায়গায় বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিসেপটিক ক্রিমের প্রচলন থাকলেও বাঙালির কাছে বোরোলিন হল মায়ের যত্ন ও আদরের মতোই অতুলনীয় ও অনবদ্য যার কোন পরিবর্ত হয় না।

Image result for জেলুসিল

জেলুসিল–

বাঙালির চিরাচরিত খাদ্যের প্রতি মোহ অথবা খাদ্য রসিক বাঙালির ভুড়ি ভোজনের জন্য তার বদহজমের রোগটিও মাঝেমাঝেই কিঞ্চিত মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তাই বদহজমের উপশমের জন্য জেলুসিল ছাড়া বাঙালির গতি নেই। বাঙ্গালীর সাথে এই ধারণা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে যে, যা খুশি খাওয়া হোক না কেন, তার পরিমাণ যতই মাত্রাতিরিক্ত হোক না কেন এই জেলুসিল নামক ওষুধটি তার বদহজমের যাবতীয় যন্ত্রণার উপশম করবে এবং তাকে যথারীতি সুস্থ এবং চাঙ্গা রেখে আরো বেশি পরিমাণ খাদ্য আহরণে তার সাহায্য করবে।

Image result for boroline of bangalee

কেয়োকার্পিন —

অনেকেই হয়তো জবাকুসুম তেলের জন্য তর্ক করবেন কিন্তু বাঙালির যে একটি বিশেষ মোহ রয়েছে কেয়োকার্পিন তেলের প্রতি, তা অস্বীকার করা যায় না। তারা এই তেল মাথায় যে শুধুমাত্র লাগায়, তা নয়। সাথে সাথে এই তেল তারা গায়ে মাখে বডি অয়েল হিসাবে। চান করবার পরে অথবা শ্যাম্পু করবার পরেও তারা কেয়োকার্পিন তেল মাখতে ভোলে না, যাতে সারাদিন ধরে সুগন্ধিত তেলের গন্ধ তাদের নাকে লেগে থাকে।

Image result for ট্যালকাম পাউডার

ট্যালকাম পাওডার–

এমন কোন বাঙালিকে পাওয়া যাবেনা যে গোটা গ্রীষ্মকাল কোন রকম কোন ট্যালকম পাউডার ব্যবহার না করে কাটিয়ে দিয়েছে। বিশেষত কিউটিকিউরা যা কিনা রোদে বাঙালিকে ঠাণ্ডা রাখে এবং গরমে ঘামাচি মুক্ত রাখে, এই ধরনের ট্যালকম পাউডার অতি অবশ্যই বাঙালীর গ্রীষ্মকালীন ড্রেসিংটেবিলে শোভা পায়। শুধুমাত্র একবার মাখলেই এই পাউডার চলেনা। যতটা সম্ভব পুরু করে শুরু করে বিভিন্ন লেয়ারে এবং দিনের বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার এই ট্যালকাম পাউডারের ব্যবহার হয়ে থাকে। সমগ্র মুখে মেখে প্রায় ভ্যাম্পায়ারের মতন চেহারা করে এবং ঘাড় গলা ও হাত পুরোপুরি সাদা করে মেখে তবেই কিন্তু বাঙালি ট্যালকম পাউডারের উপযোগিতা পেয়ে থাকে।

Image result for ছাতা মাথায় সৌমিত্র

ছাতা–

একজন সত্যিকারের বাঙালি হলে অতি অবশ্যই সমগ্র ঋতুর থেকে নিজের আত্মরক্ষা করার জন্য বিশেষত গ্রীষ্ম, বর্ষা প্রতিটি ঋতুতেই নিজেকে ঢেকে রাখার জন্য আত্মরক্ষার্থে ছাতা অবশ্যই তার অন্যতম একটি প্রধান অস্ত্র। এটি বগলদাবা না করে বাঙালি সাধারণত ঘরের বাইরে পা রাখে না। একটি ছাতার উপযোগিতা একমাত্র বাঙালির থেকেই জানা সম্ভব যা কিনা সূর্যের প্রখর রোদ, বর্ষাকালের বৃষ্টি অথবা শীতের তুষারপাত, ঝড়ঝঞ্ঝা, যে কোন সময় আত্মরক্ষার্থে অব্যর্থ। শুধুমাত্র তাই নয়, রাস্তায় হাঁটার জন্য লম্বা ছড়ি হিসাবেও ছাতার ব্যবহার অত্যন্ত সুলভ। কলকাতার কে.সি.পাল অথবা মহেন্দ্র লাল দত্তর ছাতা বাঙালির হাতে পাওয়া যাবে না এরকম বাঙালি আজও দুর্লভ। একইসাথে একমাত্র ছাতার দ্বারা একাধিক কর্মকান্ড কিভাবে সম্ভব তা বাঙালি জাতির থেকেই জানা সম্ভব।

Image result for ঝর্ণা ঘি

ঝর্ণা ঘি–

বাঙালি খাদ্য রসিক। ভোজন রসিক বলে পরিচিত বাঙালির পাতে বিশেষত ভাতপাতে ঝরণা ঘি থাকবেনা, এরকম হয়না। যেখানেই থাকুক না কেন, ডাল ভাতে বাঙালি প্রথম পাতে ঝরণা ঘি অতি অবশ্যই চেয়ে থাকবে। আর ঠিক সেই কারণেই বর্তমানে লোকাল মার্কেটে ছোট-বড় নানা আকৃতির কাঁচের অথবা প্লাস্টিকের বোতলে ঝরনা ঘি এর বিক্রি এখনো বাজারে অন্যতম সেরা মুদির দোকানের বিক্রি। শহরাঞ্চলে অথবা গ্রামাঞ্চলে যারা থাকে না অর্থাৎ কিনা পশ্চিমবঙ্গের বাইরে যারা থাকে তাদের ক্ষেত্রে আমূল অথবা অনিক ঘি কিন্তু কোনভাবেই ঝরনা ঘি এর পরিবর্ত হিসাবে ব্যবহৃত হয় না। অন্তত বছরে একবার হলেও কলকাতার বাইরে থাকা বাঙালি ঝরণা ঘিয়ের জন্য দূরবর্তী স্থান থেকে হলেও এটি আমদানি করে নিজের রান্না ঘরে রেখে থাকে।

Image result for খাঁটি সরিষার তেল

সরষের তেল–

বাঙালিকে যদি সর্ষের তেল দিয়ে পাস্তা রান্না করতে বলা হত তাহলে বোধহয় বাঙালির মতো খুশি আর কেউ হতো না। সর্ষের তেল হল বাঙালির খাদ্য প্রক্রিয়ার এমন একটি রন্ধন কৌশল যা বাঙালীর রান্নাঘরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটি শুধুমাত্র যে আলু ভাজা বা বেগুন ভাজা ভাজতে অথবা মাছের ঝোলের ক্ষেত্রে অতি প্রয়োজনীয় বিষয়বস্তু তাই নয়, এমনকি ঝালমুড়ি মাখতেও বাঙালির সরষের তেল অতি প্রিয় বস্তু। বাঙালির রান্না ঘরে সরষের তেল ছাড়া যেমন বাঙালিকে কল্পনা করা যায় না তেমনই শীতকালেও শীতের হাত থেকে বাঁচতে সরষের তেল ছাড়া বাঙালিকে ভাবা যায়না। সর্ষের তেল সহযোগে গাত্র মর্দন এবং সাথে হালকা শীতের উষ্ণ আমেজ বাঙালির অতি প্রিয় বস্তু।

Image result for হারমোনিয়াম

হারমোনিয়াম —

কিছু কিছু বাঙালি বাড়ি এখনও পর্যন্ত হারমোনিয়াম বিবর্জিত অবস্থায় রয়ে গেছে। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি বাঙালির ছুটির দিন এবং সকালবেলায় গোল হয়ে হারমোনিয়ামের চারদিকে ঘিরে বসা সকল বন্ধু-বান্ধবের আড্ডা এবং দুপুরবেলায় মাছের ঝোল, এগুলি একমাত্র বাঙালিকেই মানায়। রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল গীতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের আধুনিক গান সহযোগে বাঙালির অতিপরিচিত প্রাক্তন আড্ডা মারার উপকরণগুলি এখনো পর্যন্ত কিছু কিছু বাঙালি বাড়িতে শোভাবর্ধন করে। শুধুমাত্র তাই নয় এখনো পর্যন্ত বাঙালি গৃহস্থবাড়িতে ছেলেমেয়েরা গান শেখার জন্য হারমোনিয়াম ব্যবহার করে। এই অতি পরিচিত সৌখিন মনোরম বাদ্যযন্ত্রটি বাঙালীর প্রাণের সাথে জড়িয়ে আছে।

Related image

উত্তম সুচিত্রার সিনেমা–

বাঙ্গালীর আড্ডা এবং আরাম চেয়ারে বসে বসে চা এবং বিস্কুট সহযোগে বিনোদনের একাকী সময় কাটানো আজ অতীত। উত্তম এবং সুচিত্রার বিভিন্ন সিনেমার গান এবং অতি পরিচিত বিখ্যাত সকল সিনেমা যেমন সপ্তপদী, হারানো সুর, সাগরিকা ইত্যাদি আজকের যুগেও ডিভিডি অথবা ল্যাপটপের দৌলতে বাঙালির ঘরে শোভা পায়। বাঙালির সান্ধ্যকালীন ছুটির আড্ডা পরিপূর্ণ হত না একসময় উত্তম সুচিত্রা অভিনীত বিভিন্ন রোমান্টিক সিনেমা না হলে। তবুও এখনও সেই নস্টালজিয়া বর্তমান। কিছু অতীত তো থেকেই থাকে যা বর্তমানেও বাঙালিয়ানার ষোলআনাকে সাথে নিয়েই গাঁটছড়া বেঁধে বর্তমানকে পাশে রেখে ভবিষ্যতের দিকে চলেছে।


শেয়ার করুন সকলের সাথে...
  • 1.8K
    Shares

Sponsored~

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*