মাত্র দশমাসেই ত্রিপুরায় পায়ের তলার মাটি হারাচ্ছে ক্ষমতাসীন বিজেপি !! উঠছে প্রশ্ন…

শেয়ার করুন সকলের সাথে...
  • 77
    Shares

তপন গুহ ~আগরতলা, ত্রিপুরা

 

২০১৯ এর লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে সারা দেশের সাথে ত্রিপুরা রাজ্যের জাতীয় কংগ্রেসের দলের পক্ষে অদৃশ্য অনুকূল হাওয়া বইতে শুরু করেছে, এমনটাই গর্বের সাথে দাবি করেন রাজ্য কংগ্রেস দলের প্রথম সারির আইনজীবী নেতা । তিনি বলেন প্রতিদিন যে কত শত বিজেপি দলের নেতাদের থেকে ফোন আসে তার ইয়ত্তা নেই সবার ই একক ‘রা’ – কংগ্রেস ছেড়ে ভুল করেছি। তারা এটাও বলেন সিপিএমের দীর্ঘ ২৫ বছরের বঞ্চনা থেকে মুক্তি পেতে অনিচ্ছাকৃতভাবে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিলাম।

কিন্তু এখন নোটবন্দি, জিএসটি, সি বি আই, আর বি আই এবং সর্বশেষ রাফাল দুর্নীতি নিয়ে নক্কারজনক ঘটনায় তারাও বিব্রত। মুখে কুলুপ এঁটে প্রধানমন্ত্রীকে উলঙ্গ রাজার মতো পালিয়ে বেড়াতে দেখে দলের নেতা কর্মীরা হতভম্ব। রাজ্য বিজেপির কর্মী থেকে শুরু করে সাধারন সর্মথকরা অনিশ্চিত ও উৎকণ্ঠায় ভুগছে। তাই তারা পুরনো হাবেলি দুর্গ রক্ষক এর সাথে যোগাযোগ করতে শুরু করেছে বলে দাবি করেন রাজ্য কংগ্রেস নেতৃত্ব।
ঘন ঘন দল পাল্টানো, নির্বাচনে নব‍্য দলের চিন্হে ভোটারদের আশির্বাদ প্রাপ্তি তে জয়লাভ ঘটনা এরাজ‍্যে আকছার ঘটছে। তাই এখন দল পাল্টানোর ব্যাপারে সাধারণ ভোটাররা কি ভাবছেন সে বিষয়ে রাজনীতিবিদদের দুশ্চিন্তার কারণ নেই বলা যেতেই পারে ।

Image result for tripura election

“কমিটেড ভোটার”এর সংজ্ঞা আজকাল অনেক নড়বড়ে হয়ে গেছে বলে মনে করা হয়।

নির্বাচনে র আগে সবকটি দল ই, নিজস্ব ভোটারদের সংখ্যার জলটা মেপে নিয়েই রণকৌশল তৈরী করে রাখেন। কিন্তু এখন মানুষ দলদাস প্রথাকে বর্জন করে স্বাধীন মতামত প্রকাশ করতে চায় বলেই বোধহয় রাজনীতিবিদদের একটু অসুবিধা হয়ে গেছে।

ভারতবর্ষের স্বাধীনতার পরে কংগ্রেস দলের একটানা ৪০ বছর শাসন কালে কমিউনিস্ট পার্টি সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের পার্লামেন্টে এমপি সংখ্যা উত্থানপতন দেখা গিয়েছে অনেক বার। রাজ্য ভিত্তিক অন্যান্য দলগুলিকে মানুষ গ্রহণ করলেও বিজেপি দল কিন্তু দেশের মানুষ গ্রহণ করেনি অন্তত ৪০ টি বছর। ১৯৮৪ সালের নির্বাচনে এই দলের দুই নেতাকে পার্লামেন্টে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছিল মাত্র দুটি কেন্দ্রের মানুষ।

মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকারী নাথুরাম গডসের গোরা হিন্দুত্ববাদ আরএসএস দ্বারা পরিচালিত দল বলেই হয়তো মানুষ তাদের বিশ্বাস করেনি সুদীর্ঘকাল। প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর একটি ঐতিহাসিক ভুল সিদ্ধান্ত ১৯৮৬ সালের পয়লা ফেব্রুয়ারি বাবড়ি মসজিদের দীর্ঘকালের বিতর্কিত তালা খুলে দেওয়া।

Image result for advani rath yatra

তখনই বিজেপি দল বিন্দুমাত্র কালবিলম্ব না করে, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উন্মত্ততা সৃষ্টি করতে বাবরি মসজিদের জায়গায় রাম মন্দির তৈরি করার জন্য ভক্তদের রাম ছাপের ইঁট দান এবং কর সেবা আহ্বান জানায়।
অন্যদিকে বিজেপি দলের কট্টরপন্থী নেতা লালকৃষ্ণ আদভানি এবং মুরলী মনোহর যোশী রথের উপর শ্রী কৃষ্ণ সেজে অশ্বমেধ পরিক্রমা করতে লাগলেন রাজ্য থেকে রাজ্য। তখন প্রতিটি রাজ্যে হিন্দু ধর্মের উপর আস্থাশীল মানুষেরা শাঁখ বাজিয়ে উলুধ্বনি দিয়ে রথ কে স্বাগত জানিয়েছিল। যদিও সেই রথ বিহার রাজ্যে প্রবেশ করার পরই লালু প্রসাদ যাদব বাহিনীর লাঠিধারীদের কাছে সুদর্শন চক্রধারী লালকৃষ্ণ আদভানি গ্রেফতার বরণ করে রণেভঙ্গ দিতে বাধ্য হয়ে ছিল।

তার পরবর্তী দশটা বছর কেন্দ্রীয় ক্ষমতার রাজনীতিতে বহু উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে গিয়েছে তারমধ্যে রাজীব গান্ধীর হত্যাকান্ড দেশের মানুষ কে কংগ্রেস দলের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং আবেগ তাড়িত করে। এই দলকে সাধারণ মানুষ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেন। অপরদিকে ধর্মীয় রাজনীতির ভিঁতে ততদিনে শক্ত জমি তৈরি করে নিয়েছিল বিজেপি।
যার ফলশ্রুতিতে ১৯শে মার্চ ১৯৯৮ অটল বিহারীর নেতৃত্বে এনডিএ জোট দিল্লির মন্ত্রিসভা গঠন করতে সক্ষম হয়েছিল পূর্ণ মেয়াদ এর জন্য। জোটধর্ম পালন করে এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদ কে প্রশ্রয় না দিয়েও পাঁচ বছর বাদে এই দল ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু দেশের মানুষের কাছে বিকল্প দেশের সর্ববৃহৎ দলের মর্যাদায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিল তারা। যার উপর ভিত্তি করে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় অধিষ্ঠিত হয়েছে বিজেপি দল।

Image result for bjp victory

আখেরে বিজেপি দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা গুজরাটের প্রধানমন্ত্রী ও দলের সভাপতি অমিত শাহ অতিমাত্রায় কর্পোরেট প্রীতি ও বিশেষত আম্বানি পরিবারের সাথে অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ায় আগামী ২০১৯ এর নির্বাচনে বিপদের সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। শুধু তাই না দেশের সবচাইতে বড় রাজ্য টাকে কট্টরপন্থী আরএসএস এর মুখ যোগী আদিত্যনাথের সরকার মধ্যযুগীয় বর্বরতা এবং ধর্মীয় গুন্ডামির ফলে দুই মেরুর রাজনৈতিক দল মায়াবতী এবং অখিলেশ কুমার কেও এককাট্টা করে দিয়েছে। আর এই দুই দলের জোট হলে তার পরিণাম কি হবে সেটা খুব সাধারণ মানুষও বোঝে। যার পরিণাম বিজেপি দল হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি কর করবে বলে মনে করে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

ভারতে প্রান্তিক রাজ্য ডান বাম উভয় দলের নেতা থেকে কর্মী সবাই কিন্তু উপরিউক্ত কথাগুলো ভালো করেই জানেন। তাই জন্য শাসক দলের কর্মীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসে ভাঁটা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

Related image

দীর্ঘ সময় বাদে নতুন একটি সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ১০ মাস পরে মানুষ ভেবেছিল কেন্দ্র রাজ্য একই সরকার হলে সোনার পাত দিয়ে ছোট রাজ্য কে সাজিয়ে তোলা হবে। বছর গড়িয়ে গেলেও একমাত্র উল্লেখযোগ্যভাবে নেশা বিরোধী সফল অভিযান এবং সরকারি কর্মচারীদের সপ্তম কমিশন ধার্য করা তাও আমার ঘোলা জলে মাছ ধরা অভিযোগ দুষ্ট ছাড়া ইতর বিশেষ পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় না। উল্টো দিকে নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা তো দূর অস্ত পুরনো রাস্তাঘাটের হাড়-কঙ্কাল চেহারা দেখলে বুঝতে অসুবিধা হয় না ১০ মাস আগে ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুটির মুখে পরিমাণমতো খাদ্যের যোগান দিতে পারছে না অভিভাবক মন্ডলী। দিবি বা কোথা থেকে, নিজেরাই তো দেউলিয়া হয়ে বসে আছে নইলে অক্সফোর্ড হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয় মেধাবী দুজন গভর্নর তিন মাসে পদত্যাগ করে পালিয়ে যায় নাকি?
রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠনের প্রথম বর্ষ পূর্তির আগেই ১৭ তম লোকসভা নির্বাচনের জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে সারাদেশ। আগামী লোকসভা নির্বাচনে বর্তমান সরকারের পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার কতটা সম্ভাবনা আছে বা নেই, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু করেছেন রাজনৈতিক পণ্ডিতেরা।
২০১৮ সালে রাজ্য বিজেপি দল ক্ষমতা দখলের আগে তাদের প্রাপ্য ভোটের হার ছিল ১.৫ শতাংশ, বিগত বাম ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানবিরোধী ভোট একত্রিত করতে জাতীয় কংগ্রেস তৃণমূল কংগ্রেসকে ভাঙিয়ে এমনকি উগ্র আন্দোলনে অভিযুক্ত জনজাতি দলকে বাক্সবন্দী করে ক্ষমতায় এসেছিল বিজেপি। এমনটা সম্ভব হয়েছিল কেন্দ্র নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ বিজেপি সরকার থাকায়।

Image result for tripura election
এখন ভাবার বিষয়, আগামী লোকসভা নির্বাচনের যদি বিজেপি দল ক্ষমতায় না আসতে পারে, তবে রাজ্য সরকার কি পূর্ণ মেয়াদ ও অধিক স্থিতিশীল থাকবে? যাই ঘটুক না কেন কেন্দ্রে বিজেপি পুনঃপ্রতিষ্ঠার না হলে মাত্র দেড় শতাংশ প্রাপ্য ভোটের ভরসায় কি বিজেপি রাজ্য রাজনীতিতে খুব আপেক্ষিক ভূমিকা গ্রহণ করতে সক্ষম হবে? আর মনে রাখা প্রয়োজন সদ্য পরাজিত বামপন্থী দল কিন্তু দশ মাস আগেও ৪২ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। তাই অদূর ভবিষ্যতে দেশের রাজনীতির সাথে সাথে রাজ্য রাজনীতির আমুল পরিবর্তনের আশঙ্কাটা উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।
আগামী নির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেস দল কেন্দ্রে ক্ষমতা দখল করতে পারলে রাজ্য কংগ্রেস হাভেলি রক্ষা করা কাদের দলে ফিরিয়ে নেবেন এবং কাদের নেবেন না সেটা সময়ই বলবে।
সর্বশেষে অন্য আরেকটা দিক তলিয়ে দেখা দরকার, আগামী কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শক্তিশালী জোটের অংশীদার হতে পারেন তবে তিনিও কিন্তু ত্রিপুরা রাজ্যের ক্ষমতার আঙিনায় হাত বাড়াতে উদগ্রীব হয়ে উঠবেন।
তাই আজ অব্দি “যদি কিন্তু”র সম্ভাবনাই আগামী দিনের উজ্জ্বল সম্ভাবনা হতে চলেছে।

 

 

Facebook Comments

শেয়ার করুন সকলের সাথে...
  • 77
    Shares

খবর এক নজরে…

No comments found

Sponsored~