ভিতরকণিকা-র ভিতরে ~ উড়িষ্যার ‘সুন্দরবন’ ভ্রমণ…

শেয়ার করুন সকলের সাথে...
  • 574
    Shares

ডিপ্রেসন কাটানোর জন্য সবচেয়ে সুন্দর বেড়ানোর জায়গা হল ভিতরকণিকা। মন ভাল করার জন্য এই স্থানটি সত্যই সুন্দর। হাওড়া থেকে ভদ্রক পৌঁছে ব্যাগ প্যাক নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলাম। ভদ্রক থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার অত্যন্ত জনপ্রিয় ভ্রমণের স্থানটির নাম চাঁদবালি। এখানে অনেকগুলি আবাসন রয়েছে যেমন অন্যান্য নিবাস, চাঁদবালি।

তাছাড়া দাঙ্গমাল, একাকুলা, গুপি এবং হাবিলখাটিতে রয়েছে ফরেস্ট লজ। দুপুরে হাওড়া থেকে উঠলেও চাঁদবালি পৌঁছাতে অনেক রাত হয়ে গেল। চাঁদবালিতে গড়ে উঠেছে ব্রাহ্মণী, বৈতরণী ও ধামারা নদীর পলিমাটি থেকেই, আর এই স্থানটির বিশেষ গ্ল্যামার বাড়িয়েছে ভিতরকনিকা অভয়ারণ্য। বলাই বাহুল্য এখানে এলে আপনি বিরল প্রজাতির একাধিক পশু-পাখি দেখতে পাবেন। প্রায় ষাটটি প্রজাতিরও বেশি সুন্দরী গাছ থুড়ি ম্যানগ্রোভ দেখতে পাবেন।

খবর২৪ তরফ থেকে সুপারিশ করছি যদি অরণ্য প্রকৃতি ভালবাসেন দেরি না করে বেরিয়ে পড়ুন চাঁদবালির উদ্দেশ্যে। এখানে সেলফি তোলার জন্য রয়েছে শিব মন্দির, পদ্ম পুকুর। সমুদ্র সৈকতও এখান থেকে খুব বেশি দূর নয়। কাছেই রয়েছে একাকুলা, বারুনেই।

Related image

আমি আবার ফেসবুকে স্বঘোষিত লেখক মানুষ। প্রকৃতির অনাবিল আনন্দ উপভোগ করতেই ইন্দ্রনাথের মতো চাঁদবালীতে নৌকোবিহারে। অনেকটা সময় এই নৌকোতে চলে গেছে। পুরোনো কথারা এসেছে মনে, ফেলে আসা সময়, প্রেম, সব মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। অঞ্চলটিতে ব্যস্ত মানুষজন রয়েছে। অনেকেই জলপথেই যাতায়াত করছেন। জেলেরা মেলে দিয়েছে জাল। অপেক্ষায়। মাছ তো উঠতেই হবে। রুটিরুজি। মাঝিকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম কলকাতাতেও চালান হয় এখানকার মাছ। এই নদীর নামটি চেনা চেনা লাগল। বৈতরণী।

এই নদী পেরিয়েই তো স্বর্গে পৌঁছে যাওয়া যায়, বাবার মৃত্যুর পর শ্রাদ্ধের সময় সেই কথাই মন্ত্রে উচ্চারণ করেছিলাম। নদীর দুই তীরে ধান জমি। ধান কাটা হয়ে গেছে। নতুন আমনের সময় আসছে। গবাদি পশুরাই রাজত্ব করছে মাঠগুলিতে। জসীমুদ্দিনের কবিতারা ফিরে ফিরে আসছে মনের মধ্যে। ধানের গোলা পরিশ্রমের নিট ফলের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। কালো সাদা আকাশে ভেসে উঠছে চাষী ভাইয়ের মুখ। আমার নৌকোর ডান পাশে আস্তে আস্তে ম্যানগ্রোভ অরণ্যের কিছুটা অংশ দেখতে পেলাম। আমার লেন্সের ভিউফাইন্ডার কেবলই গভীর বনের ভিতরে বন্য পশু পাখির খোঁজ করেই চলেছে।

মানুষ তো তাই আশা প্রচুর। মাঝি ভাই চমকে দিয়ে নিস্তব্ধতা ভেঙে দেখিয়ে দিল কুমির। এই অঞ্চলে সুন্দরবনের মতো রয়্যাল বেঙ্গল না থাকলেও রয়েছে অজস্র কুমির। জলের রাজা তার নাক দেখিয়ে ভেসে রয়েছে জলে। খিচিক খিচিক চলতেই থাকল। ভয়ও হল… এই রে পরে যাব না তো। কুমিরের এই রূপ পুরো পয়সা উসুল হয়ে গেল। মাঝির থেকে জানলাম এরা আমার মতো চর্বিওয়ালা মানুষ নাকি পেলেই কপাৎ করে গিলে নেবে।

Image result for bhitarkanika

আপনাদের আজ বলতেই পারি আমি তেমন তথ্য না নিয়েই বেরিয়ে পরেছি। মন কেমনের বাঁশি আমায় এনেছে এই ভিতরকণিকায়। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনের পরেই ভারতবর্ষের দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য হচ্ছে উড়িষ্যার ভিতরকণিকা যা নোনা জলের কুমিরদের জন্যই বিখ্যাত। সবচেয়ে বড় সাইজের কুমির এই নোনাজলেই আপনিও আসলে দেখতে পাবেন। এরা ওজনেও সরীসৃপের মধ্যে বৃহত্তম।

কিছু দূরেই সঙ্গমস্থল। মানে বৈতরণী নদীর সাথে মিলিত হয়েছে ব্রাহ্মণী নদী। স্থানটি প্রায় ৬৫০ বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত। সব মিলিয়ে উড়িষ্যার সুন্দরবন হল ভিতরকণিকা অভয়ারণ্য। ভিতরের কী আছে, সেটার রহস্য উন্মোচন করছি এই বনের ভিতরে। থ্রিলিং ব্যাপার। লুকিয়ে রয়েছে অজানা কিছু মুহূর্ত। যা চিরকালীন আমার ক্যামেরায় ধরা দেবে। খুব তীক্ষ্ণ ও সজাগ থাকতে হবে। না হলেই মিস করে যাবেন এই অপরূপ সৌন্দর্য। অন্যমনস্ক হলেই গন্ডোগোল, কোন সিনটা যে মিস করবেন, তারপর দেখবেন তা অন্য বন্ধু তুলে নিয়েছে ক্যামেরায়। তাই অন্যদের ক্রেডিট দিতে না চাইলে নিজের চোখ কান খোলা রাখবেন। আবার নৌকো থেকে টাটকা কুমিরের পায়ের ছাপ দেখে ভাবতেই পারেন, আমার কপালে সেই বড় প্রকান্ড কুমিরটার দেখা নেই।  কিছু কচ্ছপ দেখলাম। ছোট ছোট ভর্তি কচ্ছপ। খুবই সুন্দর লাগল।

সাধারণত এখানে ডাংমলে দুপুরের খাওয়ার খাওয়ানো হয়। আমি এদিক সেদিক একটু ঘুরে নিলাম। ঐ হাতে ক্যামেরা থাকলে যা হয়। লাঞ্চ করে এবার যাত্রা অরণ্যের ভিতরে শিব মন্দির। জানলাম পায়ে হাঁটা এই পথটা তিন কিলোমিটার। প্রথমে একটু ভয় লাগলেও পরে দেখলাম, পথটা একঘেয়ে নয়। প্রতিটা গাছ যেন আমার সাথেই কথা বলার জন্য অপেক্ষা করছিল। সব বিদেশি ট্রাভেল চ্যানেল এখানে এলে ঢাহা ফেল হয়ে যাবে। ম্যানগ্রোভ উপত্যকায় পুরোপুরি ভিন্ন ফ্রেম।

শিব মন্দিরের পাশেই পুরানো স্থাপত্য নিদর্শন। কেল্লার মিনিয়েচার বলতেই পারেন। মনে হয় এক সময় এখান থেকেই শিকার করতেন কেউ কেউ। কাছেই পাখি দেখার জন্য তৈরি করা হয়েছে ওয়াচ টাওয়ার। আমার ব্যাড লাক খুব কম পাখি আজ আমার ভাগ্যে জুটেছে। যদিও পড়ন্ত বিকেলে কনে দেখা আলোতে আমি যে দু একটি নারীকে দেখিনি, সে কথা বলব না। কথা বলে জানলাম দুর্গা পুজোর সময় পাখির নানা প্রজাতি এখানে বেশি দেখা যায়।

ডাংমলে কুমির সংরক্ষণ প্রকল্পের কার্যকলাপ সম্বন্ধে জেনে মনে হল ভারতেও হয়। বস ভারতেও পশু সংরক্ষণ হয়। সুন্দর পরিবেশ। সামনে এক্সক্লুসিভ বাংলো।  বাংলোর সামনেই রয়েছে ডিয়ার পয়েন্ট। আপনিও এখানে এসে যদি গেয়ে ওঠেন – তোরা যে যা বলিস ভাই…আমি কিন্তু আশ্চর্য হবো না। নিরিবিলিতে এতো সুন্দর অপার্থিব সেরেনিটি কম স্থানেই রয়েছে।

ফিরতি পথে কয়েকটি ঘড়িয়াল জাতীয় প্রাণী দেখলাম। হঠাৎ নৌকার সামনে ১৪ – ১৫ ফুটের একটি কুমির চলে এসেছিল। দিলটা পুরো হাতে নিয়ে ভাবছি, ক্রোকোডাইল সিনেমার মতো উল্টে পাল্টে দেবে নাকি! হা করে চোয়ালটা খুলেছিল। আমি তো সেখানে নস্যি। না তেমন কিছু আর হল না। নদী পথের তাই পাগল করা লাল কাঁকড়া, রঙিন মাছ ও মাডস্কিপার দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হল। গোসাপ তো এদিক ওদিক তাকালেই দেখতে পেলাম। সুন্দরী হরিণের লাফালাফি দেখতে দেখতে বলতে পারি স্থানটি ফাটাফাটি সুন্দর। ভয়ংকর সুন্দর।

সন্ধ্যা নেমে আসছে। জোয়ারের জল বাড়ছে হু হু করে।  দুই পাশে গাছের ডালে চেনা এবং অচেনা নানান পাখি, আমাদের জন্যই বসে রয়েছে।  সঙ্গম স্থলে যখন গিয়ে পৌঁছালাম হাওয়ার দাপটে নৌকার তখন টালমাটাল অবস্থা।  তবু এইসমস্ত বাধাবিঘ্ন পেরিয়ে চাঁদবালীতে সন্ধ্যার মুখেই ফিরে এলাম।

এখানে দিন দুয়েক থাকলাম। তবু ফিরতে তো হবেই। কত কাজ বাকি। কত খবর লিখতে হবে।  ফিরে আসার দেড় সপ্তাহ পরেই দেখলাম একটি খবরে বেড়িয়েছে ভিতরকণিকার কুমিরের আক্রমণে মৃত্যু হয়েছে এক মায়ের। তার কন্যার অবস্থাও আশঙ্কাজনক।  আমার কিন্তু মনকেমনিয়া দৃষ্টিতে হাল বয়ে নিয়ে চলা মাঝির চোখ ও দূরে জল পেরিয়ে নীল দিগন্ত, সঙ্গমস্থল, হা করে থাকা কুমির সবটুকু মনে পরে গেল…আমি তো আমিতে নেই, আমি তো ভিরতকণিকায়…

আসুন দেখে নেওয়া যাক সেই সুন্দর অরন্যের কিছু দৃশ্য ঃ~


শেয়ার করুন সকলের সাথে...
  • 574
    Shares

Sponsored~

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.