খবর ২৪ ঘন্টা

যুগযুগ ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন – আছেন এই সকল নারীরাই ~ নারী দিবসে তাদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য…

শেয়ার করুন সকলের সাথে...

Web Desk:  যুগে যুগে সমাজব্যবস্থার পরিবর্তনের ফলে শুধু যে সামাজিক মূল্যবোধের পরিবর্তন ঘটেছে তাই নয় বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন মহিলা তাদের নিজেদের ক্ষমতার বলে ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছেন। শুধু ক্ষমতা নয় তাদের বুদ্ধিমত্তা, নেতৃত্ব দেবার ক্ষমতা, শক্তি এবং তাদের দায়িত্ববোধের চূড়ান্ত পরিচয় দিয়ে ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে নিজেদের নাম খোদাই করেছেন।

১.জেনোবিয়া —

জেনোবিয়া ছিলেন সিরিয়ার পালমায়রিন সাম্রাজ্যের রাণী, যিনি রোমান সাম্রাজ্যের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলেন তৃতীয় শতাব্দীতে।তিনি ঈজিপ্ট, অ্যান্টোলিয়া, লেবানন এবং রোমান জুডি দখল করেছিলেন। অবশেষে তিনি রোমান সম্রাট অরেলিয়ান দ্বারা পরাস্ত হন।

২.ক্লিওপেট্রা —

টলেমাইক ঈজিপ্টয়ের (Ptolemaic Egypt) শেষ ফারাও ক্লিওপেট্রা তাঁর অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা, দেশের বিকাশ ও অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য ইতিহাসে বিখ্যাত। তিনি তাঁর দুই প্রেম সম্বন্ধের জন্যও যথেষ্ট পরিচিত ও পৃথিবী বিখ্যাত। তাঁর দুই সুবিখ্যাত প্রেমিক ছিলেন রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার ও মার্ক অ্যান্থনি।

৩.ঝাঁসির রাণী লক্ষীবাই —

ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ ছিলেন ভারতবর্ষে আঠারোশো সাতান্ন সালে প্রথম ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতার অন্যতম নেতৃত্বদানকারী প্রথম নারী। তাঁকে ভারতবর্ষের জোয়ান অফ আর্ক (Indian Joan of Arc”) বলে অভিহিত করা হয়। রাণী লক্ষীবাই ছিলেন প্রথম যিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে সরাসরি যুদ্ধে পর্যুদস্ত করেছিলেন এবং ব্রিটিশদের ভারত শাসনের স্বপ্নে প্রথম পদাঘাত করেছিলেন।

৪.জোয়ান অফ আর্ক —

জোয়ান অফ আর্ক ছিলেন একজন ফ্রেঞ্চ হিরোইন এবং একজন রোমান ক্যাথোলিক সন্ন্যাসিনী। তাঁর বিভিন্ন অলৌকিক ক্ষমতা ছিল বলে জানা যায়। তিনি বিভিন্ন ধরনের অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেতেন এবং বিভিন্ন কথা শুনতে পেতেন যা তাঁর ঐশ্বরিক ক্ষমতার প্রমাণ স্বরূপ বলে বর্ণিত হয়েছিল। ইংরেজ বাহিনীকে যুদ্ধে পরাস্ত করেছিলেন ফ্রেঞ্চ বাহিনীর হয়ে নেতৃত্ব দিয়ে। শেষে তিনি ইংরেজদের দ্বারা বিশ্বাসঘাতকতার সম্মুখীন হন এবং তাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। তার অবিচলিত বিশ্বাস এবং জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ভূমিকা ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আজ একটি কাহিনী হয়ে গেছে যা ইতিহাসের পাতায় তাঁর নাম খোদাই করে গেছে।

৫.ইন্দিরা গান্ধী —

ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন ভারতের প্রথম এবং একমাত্র মহিলা প্রধানমন্ত্রী যিনি 1966 থেকে 1984 সাল পর্যন্ত ভারতে রাজনীতিতে মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ভারতীয় রাজনীতিতে একজন বিতর্কিত অথচ অত্যন্ত ক্ষমতাশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন যিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন যার ফলে বাংলাদেশের উৎপত্তি হয়েছিল। তিনি তাঁর দেহরক্ষীদের দ্বারা খুন হন।

৬.মার্গারেট থ্যাচার —

মার্গারেট থ্যাচার ছিলেন ব্রিটেনের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী যিনি 1979 থেকে 1990 পর্যন্ত ব্রিটেনের রাজনীতিতে অন্যতম মুখ্য ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর বহুলচর্চিত লৌহমানবী বা ‘iron lady’ নামে অভিহিত এবং সবথেকে দীর্ঘকালীন সময় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থাকার রেকর্ডধারী। তিনি 1982 সালে ফকল্যান্ড যুদ্ধে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন। কিন্তু তার অর্থনৈতিক ভূমিকা মিশ্র প্রতিক্রিয়া উৎপন্ন করেছিল যেহেতু তিনি একটি মুক্ত বাণিজ্য অর্থনীতির পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন এবং শ্রমিক সংগঠনের ভূমিকা ও ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।

৭.রাণী ভিক্টোরিয়া —

রানী ভিক্টোরিয়া ছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্যতম নেতৃত্বদানকারী এক ক্ষমতাবান ব্যক্তিত্বময়ী রানী যিনি বিশাল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের 63 বছর ধরে ব্রিটিশদের শাসন করেছিলেন।সমগ্র পৃথিবীর প্রায় ছয়টি উপমহাদেশে তাঁর সাম্রাজ্যবাদ বিস্তৃত হয়েছিল। এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম সাম্রাজ্য বলে ইতিহাসে বর্ণিত। তাঁর সাম্রাজ্যবাদ এতটাই বহুলচর্চিত যে তাঁরর শাসনকালকে “Victorian era ” বলে বর্ণনা করা হয়। তাঁর সময়ে এবং তার নেতৃত্বে ব্রিটিশ কলোনি থেকে দাস প্রথা সম্পূর্ণভাবে উচ্ছেদ করা হয়েছিল এবং সমগ্র ব্রিটিশ জনসাধারণের জন্য ভোট ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের অধিকার স্থিরীকৃত হয়েছিল। তিনি সকল শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি করেছিলেন এবং সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনের সাথে সাথে সাম্রাজ্যবাদী মনোবৃত্তির আঙিনায় থেকে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতেও বহুল পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন।
***শুধুমাত্র ইতিহাসেই যে আমরা এমন সকল ব্যক্তিত্বময়ী নারীর পরিচয় পাই যারা পুরুষশাসিত সমাজে নিজেদের বুদ্ধিমত্তা ও ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে নিজেদের আলাদা জায়গা করে নিয়েছিলেন তা নয় বরং বর্তমান পৃথিবীতে, আজকের সমাজ এবং রাজনীতিতে এই ধরনের ব্যক্তিত্বময়ী এবং অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ হিসেবে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নারী তাদের মনোবৃত্তি জনসাধারণের কাছে তুলে ধরেছেন এবং তাদের নেতৃত্বের মাধ্যমে সেই সকল দেশ সমগ্র পৃথিবীতে আজ বহুল পরিচিত। তাহলে জেনে নেওয়া যাক আজকের পৃথিবীর সেই সকল বহুল চর্চিত এবং পরিচিত ব্যক্তিত্বময়ী নারীকে যাঁরা আজকের দিনের পৃথিবীর অন্যতম সম্মানীয় নারী হিসাবে পরিচিত এবং পুরুষতান্ত্রিক দুনিয়ায় নিজেদের শাসন কায়েম করতে পেরেছেন…

১.দিলমা রাউসেফ —

দিলমা রাউসেফ হলেন ব্রাজিলের নেতৃত্বদানকারী প্রথম মহিলা প্রেসিডেন্ট । তিনি ব্রাজিলে”লৌহ মানবী” হিসাবে গণ্য। তিনি বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাবান মহিলাদের অন্যতম। রাউসেফ 2011 সালে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। 1970 সালে দেশে সামরিক শাসন কায়েম থাকার সময় দিলমা অত্যাচারিত হয়েছিলেন এবং তাঁকে কারাগারে যেতে হয়েছিল।

২. ক্রিসটিনা ফার্নান্দেজ ডি কার্চনার–

ক্রিসটিনা ফার্নান্দেজ ডি কার্চনার আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় মহিলা রাষ্ট্রপতি ছিলেন যিনি দ্বিতীয়বার পুনরায় নির্বাচিত মহিলা রাষ্ট্রপতির তকমা পেয়েছিলেন। একটি প্রচারাভিযান সমাবেশে তাঁর নাচের একটি ভিডিও ইউটিউবে 2,00,00 উপর দ্রষ্টব্য হয়েছে। তাঁর ব্যক্তিত্ব ও আকর্ষণীয় বুদ্ধিমত্তার জন্য তিনি বিখ্যাত।

৩.শেখ হাসিনা ওয়াজেদ–

ফোবর্সয়ের তালিকায় বর্তমানে পৃথিবীর প্রথম একশত ক্ষমতাবান ব্যক্তিত্বের মধ্যে শেখ হাসিনা অন্যতম।১৯৯০ সালে এরশাদ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন, ২০০৭ সালে গ্রেপ্তারবরণ , ২০০৮ সালের ১২ জুনে মুক্তিলাভ এবং ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২৬৪টি আসন লাভ করে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তৃতীয়বারের মতো তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। তাঁর ক্ষমতা, রাজনৈতিক জ্ঞান, সাহসিকতা, নেতৃত্বগুণ আর ব্যক্তিত্বের জন্য দেশবিদেশের নামকরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি নানান সম্মান ও শ্রদ্ধা লাভ করেছেন।

৪.কেরিটি কালজুলিদ —

কেরিটি কালজুলিদ 2016 সালে এস্তোনিয়া থেকে পঞ্চম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দেশটির স্বাধীনতার পর থেকেই এস্তোনিয়া প্রদেশের প্রথম মহিলা প্রধান হিসাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং 46 বছর বয়সে সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে নির্বাচিত হন। তার আগে, কালজুলিদ 2004 সাল থেকে 2012 সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় কোর্ট অব অডিটরস এস্টোনিয়ার প্রতিনিধিত্বকারী সাবেক রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা ছিলেন।

৫.অ্যাঙ্গেলা ডোরোটেয়া মেরকেল–

ফোর্বসের তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন লৌহমানবী হিসেবে খ্যাত জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা ডোরোটেয়া মেরকেল। কোয়ান্টাম গবেষক এই বিজ্ঞানী ১৯৯০ সালে প্রথম রাজনীতির আঙিনায় আসেন। জার্মানির ইতিহাসে তিনিই দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকা নির্বাচিত চ্যান্সেলর প্রথম নারী। সিরিয়ার উদ্বাস্তু সমস্যা আর গ্রিসের অর্থনৈতিক সমস্যা নিয়ে তাঁর বক্তব্য বিশ্লেষকদের চোখে পৃথিবীর ক্ষমতাধরদের তালিকায় তাঁকে এক নম্বরে পৌঁছে দিয়েছে।

৬. ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ–

রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ হচ্ছেন বিশ্বের ১৬টি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বর্তমান রানী ও রাষ্ট্রপ্রধান।এছাড়াও তিনি ৫৪ সদস্যবিশিষ্ট কমনওয়েলথ অব নেশনসেরও প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দ্বিতীয় এলিজাবেথ যুক্তরাজ্যের শাসনকর্তা এবং চার্চ অফ ইংল্যান্ডেরও প্রধান। বিশ্বজুড়ে তুমুল জনপ্রিয় রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ সম্প্রতি ব্রিটিশ রাজসিংহাসনে আরোহণের ৬০ বছর পূর্ণ করলেন। ব্রিটেনের হাজার বছরের ইতিহাসে তিনি হলেন দ্বিতীয় যিনি দীর্ঘতম সময় সিংহাসনে আসীন। তাঁর আমলে ব্রিটেনে ১২ জন প্রধানমন্ত্রী, যুক্তরাষ্ট্রে ১২ জন প্রেসিডেন্ট ও ছয়জন পোপ নির্বাচিত হয়েছেন।

৭. ডালিয়া গ্রাইবস্কেইট —

ডালিয়া গ্রাইবস্কেইট লিথুয়ানিয়ার বিখ্যাত মহিলা রাজনীতিবিদ এবং বর্তমান রাষ্ট্রপতি। তিনি ২০০৯ সালে লিথুয়ানিয়ার রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ‘লৌহ মানবী’ নামে পরিচিত। তিনি স্পষ্টভাষী, সাহসী,বুদ্ধিমতী ও সঠিক নেতৃত্বদানকারী। প্রশাসনিক জ্ঞানের পাশাপাশি তাঁর কঠোর পরিশ্রম তাঁকে প্রথম মহিলা রাষ্ট্রপতি করার মাধ্যমে ইতিহাস রচনা করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজেটে প্রস্তাবিত তাঁর পরিবর্তনগুলি প্রশংসিত। তিনি LGBT (সমকামী, গে, উভকামী, ট্রান্সজেন্ডার) সম্প্রদায়ের একটি শক্তিশালী সমর্থক এবং এই গোষ্ঠীর উন্নতির জন্য কাজ করে এমন এনজিওদের তিনি সাহায্য করেন।

Facebook Comments

শেয়ার করুন সকলের সাথে...