অরূপ তোমার বাণী : পর্ব ১ ~ সুদেষ্ণা চক্রবর্তী

শেয়ার করুন সকলের সাথে...
  • 2
    Shares

অরূপ তোমার বাণী : পর্ব ১

সুদেষ্ণা চক্রবর্তী

বহুদিন পর্যন্ত আমার মায়ের ধারণা ছিল , হিন্দী সিনেমা মানেই কিছু অবাস্তব গল্প , লারেলাপ্পা গান আর ঢিশুম ঢিশুম মারপিট । সিনেমা দেখতে ভালোবাসলেও মা কখনো হলে গিয়ে হিন্দী সিনেমা দেখতেন না ।

আমার মাধ্যমিকের পর বাড়িতে সাদা কালো আপট্রন টিভি এলো । তখন প্রতি শনিবার সন্ধ্যেয় হিন্দী সিনেমা দেখাতো টিভিতে । এখন মা না দেখলে , তা আমাকে ও দেখতে দেবেন না । তাই আমি কি করে জানি খুব দ্রুতগতিতে হিন্দী জবান শিখে ফেললাম । আমার কপাল জোড়ে সেদিন টিভিতে “গাইড ” হবে । আমি মাকে অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে সে সিনেমা দেখতে রাজি করালাম , এবং অপরিসীম দক্ষতার সঙ্গে প্রত্যেকটি ডায়ালগ অনুবাদ করে দিলাম । আহা এমন নিষ্ঠা যদি মাধ্যমিকের পাঠ্যে দেখাতাম তবে ফার্স্ট ডিভিশন এর সঙ্গে তারা চিহ্ন যুক্ত হওয়ার সুবাদে টিভিতে রঙীন ছবি দেখতে পেতাম । যাকগে যাক , সেদিন আমার মাতা দেবী গাইড সিনেমার গল্পে , গানের সুরে , দেবানন্দ , ওয়াহিদা রহমানের অভিনয়ে এমন মুগ্ধ হলেন , যে পরের শনিবারে নিজে থেকেই সব কাজ সেরে , আমার পড়া টড়া ধরে , গুছিয়ে বসলেন হিন্দী সিনেমা দেখতে । আমার উদ্দেশ্য সিদ্ধ হল ।এবং তার সাথে মনের মধ্যে কিঞ্চিৎ স্লাঘাও জন্ম নিল , আমি যেকোন ভাষা খুব সহজে আয়ত্বে আনতে পারি ।

আমাদের বিয়ের দুই বছর পরে সাত্যকি ব্যাঙ্কের চাকরি ছেড়ে ভাইজাগে আর আই এন এল এ যোগ দিল । আমার বড় মেয়ে বাবলির বয়স তখন ছয় মাস । এদিকে আমি বি এড পড়ছি । আমি তাই মেয়ে নিয়ে বাপের বাড়ি রয়ে গেলাম । ঠিক দুই মাস পর সাত্যকির বিরহে কাতর আমি মেয়েকে বাবা আর আয়ার ভরসায় রেখে একা একা ভাইজাগ চললাম তিনদিনের জন্য বর টা কে একবার চোখের দেখা দেখব বলে । প্রসঙ্গতঃ জানিয়ে রাখি , তার আগে আমাকে একা কোনোদিন হাওড়া স্টেশন অবধি যেতে দেওয়া হয় নি । বাবার খুব ভয় ছিল , তাঁর ধেড়ে মেয়ে হারিয়ে যাবে । ফলতঃ প্রচুর কাকুতিমিনতি , তারপর কলেজ থেকেই একবস্ত্রে পালাব এসব হুমকি দেওয়ার পর ভাইজাগ অ্যাডভেঞ্চারের অনুমতি মিলল । আমার সে সফর আর এক বড় গল্প । অন্য একদিন বলব খন ।

ভাইজাগে পৌঁছে সেখানকার নৈসর্গিক দৃশ্য যেমন আমায় মুগ্ধ করল , তেমনি চমৎকৃত হলাম সাত্যকির মুখে অনর্গল তেলুগু ভাষা শুনে । মনে হল , যদি মাত্র দুইমাসে সাত্যকি এ ভাষাকে এতোখানি কব্জা করতে পারে তবে আমি বছরখানেকের মধ্যেই কাজ চালানোর মতো নিশ্চয়ই বলতে পারব । কিন্তু আমার বোঝা উচিত ছিল , সাত্যকির বুদ্ধি , মেধার এক শতকরা ভাগ ও আমার মধ্যে নেই । ফলে বিশ টা বছর ধরে ভাষা আয়ত্বে আনার প্রচেষ্টায় কি ছড়ান না ছড়ালাম । তবুও আমার অসংখ্য তেলুগু বন্ধুরা আমায় যে কেবল সহ্য করত তাই নয় ভালো ও বাসত খুব , কেন কে জানে ?

আমার ভাইজাগের ঝটতি সফর ছিল অগস্ট মাসে । নভেম্বর মাসের শেষে আমার ভাসুরের বিয়ে হল । তার বৌভাতের পরদিন ই মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে , মেয়েকে নিয়ে কানু বিরহিণী রাইয়ের মতো আমি মথুরা থুরি ভাইজাগ চললেম । সাত্যকি তখনো কোয়ার্টার পায়নি । তাতে কি , দাদা অর্থাৎ আমার ভাসুরও ভাইজাগ স্টিলেই চাকরি করেন । তাঁর বি টাইপ কোয়ার্টার আছে । আমার জা তখন এম এ পড়ছে চন্দননগরে । সে মাঝে সাঝে যাবে । আহা , দুই ভাইয়ের খাওয়ার কত কষ্ট ! আমার রোগা বরটা , বাড়ীর রান্না না খেয়ে খেয়ে কত্ত রোগা হয়ে গেছে । আমি না গেলে চলে ? আমার হাজারটা এঁড়ে যুক্তির মধ্যে আসল কথা বুঝতে কারোর বাকি রইল না । সুতরাং সকল হিতৈষীকে বেদম চটিয়ে শকুন্তলা পতিগৃহে যাত্রা করিল । সঙ্গে কণ্ব মুনি অর্থাৎ আমার বাবাও চললেন । সাত্যকির তখন সাতদিন ভিলাই ট্যুর আছে । সে আমাদের পৌঁছে দিয়ে , সেইদিনই রাতের গাড়ী ধরবে ।ফাঁকা বাড়ীতে কি মেয়ে নিয়ে আমি একা থাকব?

Facebook Comments

শেয়ার করুন সকলের সাথে...
  • 2
    Shares

খবর এক নজরে…

No comments found

Sponsored~

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.